বাংলাদেশ, মিশর, ইরান মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে কি হবে?

বাংলাদেশ, মিশর, ইরান মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে কি হবে?

ফন্ট সাইজ:

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। নতুন স্বাক্ষরিত এই চুক্তি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ, মিশর এবং ইরানের মতো দেশগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই চুক্তির পরিধি বাড়লে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জোট এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ খবর দিয়েছে দ্য মিডিয়া লাইন।

গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে। এর মূল লক্ষ্য সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রসারিত করা। চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয় বলে দাবি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি এবং ঢাকার কৌশলগত অবস্থান

এই চুক্তির সম্ভাব্য সম্প্রসারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং শামা ওবায়েদ সম্প্রতি জানান, ঢাকা এই চুক্তির বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং জাতীয় স্বার্থ ও দেশের অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে এতে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসনের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এবং সুষম পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। এছাড়া সৌদি আরবের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও প্রায় চার মিলিয়ন প্রবাসী বাংলাদেশি এবং তুরস্কের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক এই চিন্তাকে ত্বরান্বিত করছে। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ আলী জাফরের মতে, বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তুলতে পারে। ঢাকা যদি পাকিস্তানের সাথে কোনো সামরিক মৈত্রী বা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লিতে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দেবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তারা পশ্চিম এশিয়ার এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় যা যা প্রয়োজন সব পদক্ষপই নেয়া হবে। তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ও দূরবর্তী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং এর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুফল-কুফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই না করে ঢাকার সরাসরি এই জোটে জড়ানো উচিত হবে কি না, তা নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

ইরান ও মিসরের অবস্থান

অন্যদিকে, ইরানের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি এই জোটের বিতর্কে সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের সংসদীয় গণমাধ্যমের এক কর্মকর্তার বরাতে তেহরানের কাছে আমন্ত্রণ পৌঁছানোর কথা বলা হলেও, পরে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা অস্বীকার করে। ইরান ইনস্টিটিউট ফর বিআরআই স্টাডিজের গবেষক আলী হোসেইনি মনে করেন, এই চুক্তিতে যোগ দেওয়া ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত ভুল হবে, কারণ কাঠামোগতভাবে এই চুক্তিটি মূলত ইরানি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি ধারণামূলক প্রতিরক্ষাব্যূহ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। তবে জাফরের মতে, তেহরানের যোগদান এই চুক্তিকে একটি সংকীর্ণ নিরাপত্তা বলয় থেকে একটি বৃহত্তর মুসলিম কাঠামোতে রূপান্তরিত করতে পারে, যদিও এর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংঘাত এড়াতে ইরানকে বড় ধরনের আস্থার প্রমাণ দিতে হবে।

মিশরের অংশগ্রহণ নিয়েও রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি জানিয়েছেন যে, কায়রো বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ওফির উইন্টার বলেন, ইসরাইল ও আরব বিশ্বের বর্তমান চুক্তির প্রেক্ষাপটে মিশর কোনো একটি শিবিরে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে তার ভারসাম্য নষ্ট করতে চাইছে না। বিশেষ করে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক এবং ইসরাইলের সাথে ১৯৭৯ সালের শান্তি চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা মাথায় রেখেই কায়রোকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি এখনো প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। যদি এর পরিধি কেবল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সমমনা দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এটি একটি নতুন নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু বাংলাদেশ, মিশর বা ইরানের মতো বৈচিত্র্যময় ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দেশগুলো এতে যুক্ত হলে, তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী ও জটিল পরিবর্তনের সূচনা করবে।