হিমালয় ফুঁসছে, বিপদে ভারত-বাংলাদেশ!

প্রসঙ্গ দক্ষিণ এশিয়া

হিমালয় ফুঁসছে, বিপদে ভারত-বাংলাদেশ!

ফন্ট সাইজ:

নেপালের হড়পা বান শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়—বদলে যাওয়া পাহাড়, জলবায়ু ঝুঁকি ও উজানের তথ্য নিয়ে এখনই ভাবতে হবে ভাটির দেশকে...
প্রকৃতি সীমান্ত মানে না। পাহাড় জানে না কোথায় নেপাল, কোথায় চীন। নদী জানে না কোন রেখা পেরিয়ে ভারত, আর কোথায় বাংলাদেশ। তাই হিমালয়ের কোনো বিপর্যয়কে শুধু নেপালের সমস্যা ভেবে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই।
নেপালের সাম্প্রতিক হড়পা বান সেই কথাই আবার নির্মমভাবে মনে করিয়ে দিল। পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদ গ্রাস করেছে। মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি-গিরোং এলাকাকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

প্রথম প্রশ্ন এটি কি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল?
এখনই এর উত্তর ‘হ্যাঁ’ বলা যাবে না। একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’ প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা দেখবেন, বর্তমান উষ্ণ পৃথিবীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় কতটা বেড়েছে। কিন্তু এখানেই যেন আমরা মূল কথাটি ভুলে না যাই। হিমালয় বদলাচ্ছে।

তাপমাত্রা বাড়ছে। হিমবাহ সরে যাচ্ছে। বরফ গলছে। পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হচ্ছে। হিমবাহ-হ্রদের সংখ্যা ও আয়তন অনেক এলাকায় বাড়ছে। ফলে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগও বাড়ছে।

অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট হড়পা বান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে কি না, যেখানে চরম দুর্যোগ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে—সেটি এখন আর উপেক্ষা করার বিষয় নয়। পুরনো হিসাবের পৃথিবী শেষ!

আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় দুর্বলতা হলো, আমরা ভবিষ্যৎ তৈরি করি অতীতের হিসাব দিয়ে।

গত ৩০ বছরে নদীতে সর্বোচ্চ কত পানি এসেছে? গত ৫০ বছরে পাহাড়ে কত বৃষ্টি হয়েছে? শত বছরের বন্যায় পানির উচ্চতা কত ছিল? এসব তথ্য অবশ্যই দরকার। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এগুলোই শেষ কথা হতে পারে না। কারণ আগামী দিনের চরম আবহাওয়া অতীতের গড়কে অস্বীকার করতে পারে।

যে নদী গত কয়েক দশকে একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি ফুলেনি, সেটিই একদিন সেই সীমা কয়েক ঘণ্টায় অতিক্রম করতে পারে। যে পাহাড় স্থিতিশীল মনে হয়েছে, সেটি হঠাৎ ধসে পড়তে পারে। যে হিমবাহ-হ্রদকে নিরাপদ মনে হয়েছে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে আকস্মিক বন্যার উৎস।

তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘আগে কী হয়েছে?’ নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘আগামীতে আরও খারাপ কী হতে পারে?’

সেতু, রাস্তা, বাঁধ, বসতি সবকিছুর পরিকল্পনায় এই হিসাব ঢোকাতে হবে।

উজানের খবর কি ভাটিতে পৌঁছায়?

নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগে আরেকটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—উজানে বিপদের খবর কত দ্রুত ভাটিতে পৌঁছেছিল?

নেপালের সাবেক যোজনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান গোবিন্দরাজ পোখরেল সীমান্তে দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, উন্নত প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা থাকার প্রত্যাশা থাকলেও সময়মতো কার্যকর সতর্কতা পাওয়া যায়নি।

চীনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য নেপালের ক্ষয়ক্ষতির জন্য চীনের কোনো বাঁধ বিপর্যয়কে দায়ী করার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, হিমবাহধস ও কাদাধসের মতো প্রাকৃতিক ঘটনাই বিপর্যয়ের কারণ।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও ভূমিকম্পের বদলে হিমবাহধসের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

কে কতটা দায়ী তার চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও বিজ্ঞান দেবে।

কিন্তু তার আগে আরও জরুরি একটি প্রশ্ন আছে: উজানে যদি বিপদ শনাক্ত করা যায়, তাহলে ভাটির মানুষকে সতর্ক করা হবে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নেপাল ও চীনের জন্য নয়। ভারত ও বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

হিমালয়ের পানি শেষ পর্যন্ত সমতলের দিকে নামে। উজানের পাহাড়ে বৃষ্টি, ভূমিধস বা হিমবাহ-সম্পর্কিত বড় কোনো ঘটনা নদীর মাধ্যমে অনেক দূরে তার প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। দেশের প্রধান নদীগুলোর বিপুল পানি আসে সীমান্তের ওপার থেকে। ফলে বাংলাদেশের বন্যা ব্যবস্থাপনা শুধু দেশের ভেতরের আবহাওয়া দেখে শেষ করা যায় না। উজানে কী হচ্ছে, সেটি জানতে হবে।

শুধু নদীর পানি কত বাড়ছে তা নয়; কোথায় অতিবৃষ্টি হচ্ছে, কোথায় ভূমিধস হয়েছে, কোন হিমবাহ-হ্রদ ঝুঁকিতে, কোথায় আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি হতে পারে, এসব তথ্যও জরুরি।ভারতের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা।

অতএব দরকার একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চীনের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্যোগের তথ্য কোনো দেশের গোপন সম্পদ হতে পারে না।

কারণ একটি তথ্য কয়েক ঘণ্টা আগে পৌঁছালে হয়তো একটি গ্রাম খালি করা সম্ভব। একটি পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। একটি জীবন বাঁচানো সম্ভব।

আমরা দুর্যোগের পর ত্রাণে ব্যস্ত হই। কিন্তু জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে মূল্যবান সময়টি অনেক সময় দুর্যোগের আগেই চলে যায়।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলে, ভারী বৃষ্টি হবে। এটি প্রথম ধাপ।কিন্তু মানুষকে বলতে হবে কোথায় পানি বাড়বে, কখন বাড়বে, কোন রাস্তা বন্ধ হবে এবং কারা এখনই নিরাপদ স্থানে যাবে।এটাই কার্যকর আগাম সতর্কতা।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এই ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট তথ্য, নদী পর্যবেক্ষণ, ভূমিধস শনাক্তকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর মানুষকে সরানোর সক্ষমতাও থাকতে হবে। কারণ সতর্কবার্তা যদি মানুষের কাছে পৌঁছায়, কিন্তু মানুষ সরতে না পারে, তাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নয়।

প্রকৃতিকে থামানো যাবে না, মৃত্যু কমানো যাবে! নেপালের এই ঘটনা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জেতা যাবে না। কিন্তু ঝুঁকি কমানো যায়। হিমবাহধস ঠেকানো হয়তো সম্ভব নয়। পাহাড়ি বৃষ্টি বন্ধ করা সম্ভব নয়। হড়পা বানও সব সময় আটকানো যাবে না।
কিন্তু আগাম সতর্কতা দেওয়া যায়। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরানো যায়। নিরাপদ সড়ক তৈরি করা যায়। সেতুর নকশা বদলানো যায়। নদীর গতিপথ ও পাহাড়ের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। সীমান্তের ওপারের তথ্য সময়মতো ভাগাভাগি করা যায়।

অর্থাৎ দুর্যোগ হয়তো ঠেকানো যাবে না। দুর্যোগকে গণমৃত্যুতে পরিণত হওয়া ঠেকানো সম্ভব।
নেপালের বিপর্যয় তাই কার দোষ, এই বিতর্কে আটকে থাকলে চলবে না। তদন্ত হবে। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নির্ধারিত হবে।

কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর প্রস্তুতি আজই শুরু হওয়া দরকার। কারণ প্রকৃতি কোনো বৈঠকের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করে না। আজ হড়পা বান নেপালের পাহাড়ে নেমেছে। আগামীকাল হিমালয়ের অন্য কোনো উপত্যকায় নামতে পারে। তার অভিঘাত পৌঁছাতে পারে ভারতের কোনো জনপদে, বাংলাদেশের কোনো নদী অববাহিকায়।

উজানের বিপদ আর উজানের একার বিপদ নয়। এখন ভারত ও বাংলাদেশের সামনে তাই সরল একটি প্রশ্ন —হিমালয় যখন সতর্ক করছে, আমরা কি এখনো শুধু বন্যার পানি নামার অপেক্ষায় থাকব?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]