ব্যাটারিচালিত রিকশা: বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কৃষিশ্রমিক সংকট, দুর্ঘটনা ও বিদ্যুৎ-রাজস্ব ক্ষতি ৪,০০০ কোটি টাকা

ব্যাটারিচালিত রিকশা: বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কৃষিশ্রমিক সংকট, দুর্ঘটনা ও বিদ্যুৎ-রাজস্ব ক্ষতি ৪,০০০ কোটি টাকা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াত ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হলেও শহরের প্রধান পরিবহনব্যবস্থায় এর অবাধ চলাচল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। নগরের সড়ক সীমিত, অথচ যানবাহনের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ধীরগতির এই যানগুলো যখন বাস, গাড়ি ও মোটরসাইকেল, ট্রাকের সঙ্গে একই সড়কে পাল্লা দিয়ে চলে, তখন যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।

বিশ্বায়নের যুগে একটি আধুনিক শহর শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য নয়; ব্যবসা, পর্যটন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। দেশি-বিদেশি মানুষকে নিরাপদ, দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের সুযোগ দিতে হলে নগরের সড়কব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল রাখতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা, বিমানবন্দরসংলগ্ন সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের করিডরে ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল সেই লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ ও অননুমোদিত চার্জিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ চুরি ও সিস্টেম লসের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এসব রিকশার চার্জিংয়ে দৈনিক আনুমানিক ৭৫০–৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছে। অননুমোদিত সংযোগের পাশাপাশি অনিরাপদ চার্জিং অবকাঠামো গ্রিডের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং অগ্নিকাণ্ড, পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত অনেকে তুলনামূলক কম পরিশ্রমে দ্রুত নগদ আয় করার আশায় গ্রাম থেকে শহরে এসে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন। এর ফলে গ্রামাঞ্চল থেকে কর্মক্ষম মানুষের একটি অংশ কৃষিকাজ ছেড়ে শহরমুখী হওয়ায় কৃষিশ্রমিকের সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে বোরো ধান কাটা ও ফসল তোলার মৌসুমে শ্রমিকের ঘাটতি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং সময়মতো ফসল ঘরে তোলার অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ফলে দেশের কৃষিখাতও ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে।

শহরের প্রধান সড়ক মূলত দ্রুত ও মাঝারি গতির যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের জন্য পরিকল্পিত। বাস, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, পণ্যবাহী ট্রাক ও অন্যান্য জরুরি যানকে নির্দিষ্ট সময়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশার গতি তুলনামূলক কম হওয়ায় এগুলো একই করিডরে চললে দ্রুতগতির যানকে বারবার গতি কমাতে বা লেন পরিবর্তন করতে হয়। এতে যানপ্রবাহের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে। এছাড়াও ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো বড় যানকেও সাইড দিতে চায় না।

সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল উদ্বেগের কারণ। অনেক চালক দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ও দক্ষতা যাচাইয়ের বাইরে ছিলেন। হঠাৎ থেমে যাওয়া, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, অনিয়মিত মোড় নেওয়া কিংবা বিপরীতমুখী চলাচলের মতো আচরণ ব্যস্ত সড়কে ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে পথচারী, মোটরসাইকেল ও দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে একই জায়গায় চলাচল করলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে শহুরে অন্তত মূল সড়কে এসব যান সীমিত করা প্রয়োজন।

ব্যাটারিচালিত রিকশার আরেকটি বড় সমস্যা হলো উৎপাদন ও কারিগরি মানের অসামঞ্জস্য। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনেক যান স্থানীয়ভাবে সংযোজন, পরিবর্তন বা মেরামতের মাধ্যমে তৈরি হওয়ায় সবগুলোর ফ্রেম, ব্রেক, স্টিয়ারিং, আলো, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা একই মান অনুসরণ করে না। একটি আধুনিক নগরে চলাচলকারী যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত মান থাকা জরুরি। সেই মান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ব্যস্ত সড়কে এসব যান অবাধে চলাচল করা নিরাপদ নয়।

শহরের সীমিত সড়ক অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় ব্যবহার করাও জরুরি। নগরের প্রধান সড়কগুলো দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াত, গণপরিবহন ও জরুরি সেবার যান চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা এসব সড়কে প্রবেশ করলে রাস্তার কার্যকর ধারণক্ষমতা কমে যায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের জন্য বেশি সময় ও সড়কস্থান প্রয়োজন হয়। এর প্রভাব শুধু রিকশার যাত্রীদের ওপর নয়; পুরো নগর পরিবহনব্যবস্থার ওপর পড়ে।

ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল গণপরিবহনের কার্যকারিতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাসকে যদি বারবার ধীরগতির রিকশাকে পাশ কাটাতে হয়, তাহলে নির্ধারিত গতি ও সময়সূচি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যাত্রার সময় বেড়ে গেলে মানুষ দ্রুত বিকল্প হিসেবে মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে যানবাহনের সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই নগরের পরিবহননীতিতে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধীরগতির যানকে পৃথক রাখা অধিক কার্যকর।
পরিবেশ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাও এই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।

শহরের বিভিন্ন স্থানে অননুমোদিত বা অনিরাপদ চার্জিংয়ের কারণে অগ্নিকাণ্ড, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপের ঝুঁকি তৈরি হয়। মিটারবিহীন সংযোগে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ করাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে। ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা আবার মাটি, পানি ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে শহুরে ব্যবস্থাপনায় এই খাতকে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

তবে শহর থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা সরানোর অর্থ লাখো মানুষের জীবিকা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া নয়। এই যানগুলো স্বল্প দূরত্বের যাতায়াত এবং শেষ মাইল সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রধান সড়ক ও ব্যস্ত নগর করিডর থেকে এগুলোকে ধাপে ধাপে সরিয়ে শহরের বাইরের স্থানীয় সড়ক বা নির্ধারিত এলাকায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

এ কারণে শহুরে পরিবহননীতিতে ‘অবাধ চলাচল’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত ও শ্রেণিভিত্তিক চলাচল’কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রধান সড়ক, মহাসড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাণিজ্যিক করিডর ও উচ্চগতির সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত করা যেতে পারে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট স্থানীয় এলাকায় সীমিত ব্যবহারের সুযোগ রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি নিবন্ধন, লাইসেন্স, কারিগরি পরীক্ষা, অনুমোদিত চার্জিং এবং ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জননিরাপত্তা, সড়কের সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার এবং একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল নগর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা। এসব যানবাহনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকার গুরুত্ব অস্বীকার না করেও শহরের সব সড়কে অবাধ চলাচলের অনুমতি দেওয়া সমীচীন নয়। প্রধান সড়ক ও ব্যস্ত করিডর থেকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানীয় রুটে চলাচলের সুযোগ এবং পর্যাপ্ত বিকল্প গণপরিবহন নিশ্চিত করা গেলে নগরের গতি ও নিরাপত্তা বাড়বে, একই সঙ্গে স্বল্প দূরত্বের প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থাও বজায় থাকবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক