আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামিনের আবেদন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, আমি এখন আর জামিন চাই না। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের দুই বছরের কারাবন্দিত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ভালোবাসার মানুষ আমাকে প্রয়োজনের সময়ে পাননি। এখন বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই মন্ত্রী। বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তিনি এসব কথা বলেন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দীপু মনির জামিন চেয়ে আবেদন করেন তার আইনজীবী। গত ১৮ই আগস্ট তার স্বামী মারা গেলে প্যারোলে ১২ ঘণ্টার জন্য মুক্তি পেয়েছিলেন। দীপু মনি জামিনের আবেদন প্রত্যাহার করতে চাইলেও ডিফেন্স আইনজীবীর সম্মতিতে আবেদনটি আপাতত পেন্ডিং রেখেছে ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ১৭ই সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি তদন্তাধীন মামলার নির্ধারিত তারিখ থাকায় দীপু মনিসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এমপি-মন্ত্রীসহ ১০ জনকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। এদিন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলাকালে তাদের এজলাসকক্ষে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয়। শুনানির একপর্যায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছে কথা বলার সুযোগ চান দীপু মনি। অনুমতি পেয়ে তিনি বলেন, তার আইনজীবী জামিনের আবেদন করলেও তিনি আর জামিন চান না এবং আবেদনটি প্রত্যাহার করতে চান। দীপু মনি বলেন, আমি গত দুই বছর ধরে কারাগারে রয়েছি। কিন্তু আদালতের সামনে কথা বলিনি। আজ কিছু বলতে চাই। আমি এখন আর জামিন চাই না। আমার জামিন আবেদন প্রত্যাহার করছি।
এরপর স্বামীর অসুস্থতা ও মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, তার ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গী দীর্ঘ সাত বছর অসুস্থ ও বাকরুদ্ধ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। চোখের ইশারায় কথা বলা স্বামীর যত্ন তিনি সরকারের দায়িত্বে থাকার সময়ও নিয়েছেন বলে জানান। দীপু মনি বলেন, গত দুই বছর ধরে আমি কারাগারে থাকায় তাকে বিভিন্ন অজ্ঞাত জায়গায় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, জীবনের শেষ দিনগুলোতে স্বামীর পাশে থাকতে চাইলেও সেই সুযোগ তিনি পাননি। আবেগতাড়িত কণ্ঠে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, আমি আমার ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গীর কাছে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু স্বামীর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে থাকতে দেয়া হয়নি। আমার ভালোবাসার মানুষ যখন আমাকে প্রয়োজনের সময়ে পাননি, এখন আমার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। সন্তানরা তার জামিন চাইলেও এখন আর বাসায় ফেরার তাড়া নেই। তিনি বলেন, আমার সন্তানরা জামিন চায়। তবে আমার বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই। দীপু মনির বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, উই আর সাডেন্ড। অর্থাৎ, আদালত তার বক্তব্যে মর্মাহত। তবে জামিনের বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্যসহ আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয় বলেও জানান তিনি।
এদিকে, একইদিনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থ্যান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক যুগ্ম সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একইসঙ্গে ধনঞ্জয় কুমার দাসের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর আলম ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় তৎকালীন এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিসহ জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে হত্যাযজ্ঞে উস্কানি, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। এ ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আগামী ২৭শে অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
