হিমবাহ ধসে কীভাবে বন্যা, ভূমিধস ও সুনামি সৃষ্টি হতে পারে?

হিমবাহ ধসে কীভাবে বন্যা, ভূমিধস ও সুনামি সৃষ্টি হতে পারে?

ফন্ট সাইজ:

হিমবাহের বড় কোনো অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়া, গড়িয়ে যাওয়া বা ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসাকে হিমবাহ ধস বলা হয়। এ ধরনের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ খুব অল্প সময়ে নিচের দিকে নেমে এসে নদীর পানির প্রবাহে ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর ফলে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এমনকি বিশাল ঢেউ বা সুনামিও সৃষ্টি হতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফক্স নিউজ। হিমবাহ ধসের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বরফ গলে দুর্বল হয়ে যাওয়া, হিমবাহের ভেতরে বড় ফাটল তৈরি হওয়া, পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের অতিরিক্ত চাপ, তাপমাত্রা ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বরফের কাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়া। পাহাড়ি অঞ্চলে যখন বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটি একসঙ্গে নিচে নেমে আসে, তখন এর শক্তি অত্যন্ত বিধ্বংসী হতে পারে। বিশেষ করে কোনো নদী বা হ্রদের ওপর এ ধরনের ধস ঘটলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পানি সরে গিয়ে আকস্মিক বন্যা তৈরি হতে পারে।

গত বছর সুইজারল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বার্চ হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ নিচের উপত্যকায় ধসে পড়ে। এতে ব্লাটেন গ্রাম প্রায় চাপা পড়ে যায় এবং লোনজা নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। গ্রামের সব বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হলেও একজন ব্যক্তি নির্ধারিত নিরাপত্তা এলাকার বাইরে অবস্থান করায় নিহত হন। ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ড. সাইমন কুকের মতে, কোনো এলাকায় হিমবাহ বা ভূমিধসের ঝুঁকি আগে থেকে জানা থাকলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। এর মধ্যে টাইম-ল্যাপস ক্যামেরা, সিসমোমিটার এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় আগাম সতর্কতা পৌঁছে দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ। হিমবাহ ধসের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় আলাস্কার ট্রেসি আর্ম ফিয়র্ডে। সেখানে একটি নরম হয়ে আসা হিমবাহের ওপরের পাহাড় থেকে বিশাল ভূমিধস পানিতে আছড়ে পড়ে। এর ফলে সৃষ্টি হয় এক বিশাল ঢেউ। ঢেউটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৪৮১ মিটার বা ১৫৭৮ ফুট।

গবেষকদের মতে, এটি ছিল রেকর্ড করা ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুনামিতুল্য ঢেউগুলোর একটি। এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণ সমুদ্রের সুনামির সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। পাহাড় বা ভূমিধস বিপুল পরিমাণ উপাদান হঠাৎ পানিতে ফেলে দিলে পানি প্রচণ্ড শক্তিতে সরে গিয়ে স্থানীয়ভাবে বিশাল ঢেউ তৈরি করতে পারে। একে অনেক সময় মেগাসুনামি বলা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি বরফ গলানোর পাশাপাশি হিমবাহ ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি ভূখণ্ডের স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীরা হিমবাহ, পাহাড়ের ঢাল ও আশপাশের ভূখণ্ডে অস্থিতিশীলতার লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে। কিন্তু হিমালয়, আলাস্কা কিংবা অন্যান্য দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে এবং যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, একটি হিমবাহ ধস শুধু বরফের পতন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত বরফ, পাথর, মাটি ও পানির বিশাল ভর মুহূর্তের মধ্যে একটি পাহাড়ি এলাকাকে বন্যা, ভূমিধস কিংবা ভয়াবহ ঢেউয়ের দুর্যোগে পরিণত করতে পারে।