নেপালে একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে লেন্দেখোলা নদীটি আটকে দেয়। পরে সেই বাধা ভেঙে গিয়ে হঠাৎ বিপুল পানির স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধসই আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ। প্রাথমিকভাবে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দেশটির পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, প্রথমে ঘটনাটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধারণা করা হলেও বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোনো ভূমিকম্পই ঘটেনি।
বরং একটি হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই এই ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সেটিই ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। এ খবর দিয়েছে অনাইন গার্ডিয়ান। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ঘটনাটি ঘটে। হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট কম্পনের শক্তি ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূ-রূপবিদ সহযোগী অধ্যাপক ড্যানিয়েল শুগারের প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ০.২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরফের একটি বিশাল অংশ প্রায় ১.২ কিলোমিটার উল্লম্বভাবে নিচে পড়ে যায়।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়ে এবং প্রায় ১২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ে। স্যাটেলাইট ছবিতে আরও দেখা যায়, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় বিপুল পরিমাণ তুষার গলে গিয়েছিল। আগের দিন যেসব হিমবাহ তুষারে ঢাকা ছিল, পরদিন সেগুলোর অনেকটাই খালি বরফে পরিণত হয়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময় তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। তবে হিমবাহ ধসের সঙ্গে নির্মাণকাজও কোনোভাবে যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে শুগার উল্লেখ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাকিনটোশ বলেন, শুধু হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়েছিল, নাকি পুরো পাহাড়ের একটি অংশই হিমবাহসহ ধসে পড়েছিল- তা এখনও স্পষ্ট নয়। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এত বড় একটি হিমবাহ ধসে পড়লে প্রচুর পানি তৈরি হয়।
এরপর পানি ও পলিমাটি একসঙ্গে মিশে আরও ভারী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এভাবেই ধারাবাহিক কয়েকটি প্রাকৃতিক ঘটনা মিলিত হয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক একদল হিমবাহ গবেষক বলছেন, হিমবাহের কারণে যে এ ঘটনা ঘটেছে, তা প্রায় নিশ্চিত হলেও শুধু হিমবাহ ধসই পুরো বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ ছিল। এমনটা মনে করার কারণ নেই।
এ ধরনের বিশাল হিমবাহ ধস অত্যন্ত বিরল। অধ্যাপক ম্যাকিনটোশ বলেন, এত বড় হিমবাহ ধসের ঘটনা খুব কম নথিভুক্ত হয়েছে। তাই হিমবাহ ধসের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক কতটা- এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তবে হিমবাহের পশ্চাদপসরণ বা দ্রুত সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী- এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের আস্থা অনেক বেশি। এর পাশাপাশি উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু পাহাড়ের পারমাফ্রস্ট বা সারা বছর জমে থাকা মাটিকেও দুর্বল করছে। এই জমাট মাটি অনেকটা আঠার মতো পাহাড়ের পাথর ও কখনো কখনো তার সঙ্গে যুক্ত হিমবাহকে খাড়া ঢালে ধরে রাখে। তাপমাত্রা বাড়লে সেই ‘আঠা’ দুর্বল হয়ে পাহাড় ও বরফের স্থিতিশীলতা কমে যেতে পারে।
নেপাল, ভারত, চীন, ভুটান ও পাকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত হিমালয় অঞ্চল বিশ্বের গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলে তুষারধস, ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে নেপালের পাহাড়গুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। একই বছর প্রকাশিত আইসিমোডের এক মূল্যায়নে বলা হয়, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে গলে গেছে। ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডেও একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করে। ওই ঘটনায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন। পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার পাথর ও হিমবাহের বরফের ধস একটি অত্যন্ত বড় ও দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হয়েছিল।
হিমবাহ ধস ছাড়াও হিমালয়ের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা বন্যা। হিমবাহ গলে পানি জমে পাহাড়ের পেছনে প্রাকৃতিক বাঁধ দিয়ে ঘেরা হ্রদ তৈরি হতে পারে। সেই প্রাকৃতিক বাঁধ কোনো কারণে ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে এসে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্টের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ অ্যাড্রিয়ান ম্যাককালাম বলেন, উষ্ণ জলবায়ুতে হিমবাহ পিছিয়ে যায়, বরফ পানিতে পরিণত হয় এবং সেই পানি আটকে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে এ ধরনের হিমবাহ-হ্রদ থেকে সৃষ্ট বন্যায় ইতিমধ্যে ১২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২১টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত। নেপাল-তিব্বতের সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে বরফ গলা, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা, পাহাড় ধস এবং নদীতে হঠাৎ বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার ঝুঁকি যে ক্রমেই বড় হচ্ছে, এই ঘটনা তার ভয়াবহ উদাহরণ।
