দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান চালিকাশক্তি হলো টেকসই বিনিয়োগ এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হলে দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে বাধ্য। তবে বিনিয়োগ—তা দেশীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেই হোক কিংবা বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI)-এর রূপেই আসুক—তা কখনোই শূন্যে ভেসে আসে না। বিনিয়োগের প্রধান পূর্বশর্ত হলো নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ, যা নিশ্চিত হয় মূলত সুদৃঢ় আইনশৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের মাধ্যমে। এই দুটি মৌলিক ভিত্তির অভাব থাকলে অর্থনৈতিক সব উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রসারে সবার আগে প্রয়োজন সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করা। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা তাঁদের মূলধন সেখানে বিনিয়োগ করেন, যেখানে সম্পদের নিরাপত্তা এবং অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত থাকে। বর্তমানে কিছু কিছু জায়গায় চাঁদাবাজি, অবৈধ দখলদারি, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠছে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এসব অপকর্ম কোনো না কোনোভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গেই সরাসরি সম্পর্কিত। যখন কোনো শিল্পাঞ্চল বা ব্যবসায়িক কেন্দ্রে চাঁদাবাজি ও মব জাস্টিসের মতো ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা চরমভাবে হ্রাস পায়।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি দক্ষ, সৎ, পেশাদার ও নৈতিকতাসম্পন্ন পুলিশ বাহিনী। কারণ রাজনৈতিক পরিচয় ও অন্ধ আনুগত্যশীল পুলিশ কর্মকর্তা দিয়ে কখনোই কাঙ্ক্ষিত জনসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একজন পেশাদার ও সৎ কর্মকর্তা কেবল সরকার নয়, পুরো রাষ্ট্র ও জাতির সম্পদ। তাঁরা যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপসহীন ভূমিকা পালন করেন।
পক্ষান্তরে, যেসব কর্মকর্তা রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর ভর করে পদায়ন পান, তাঁদের প্রধান লক্ষ্য থাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট রাখা এবং ব্যক্তিগত ফায়দা লোটা। জনসেবা বা আইনের শাসন নিশ্চিত করা তাঁদের মাথায় থাকে না। সরকারের সংকটকালে এই শ্রেণিই সবচেয়ে আগে রাজনৈতিক খোলস পাল্টে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নীতিবান-পেশাদার কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যশীল কর্মকর্তার মধ্যে মূল পার্থক্য এখানেই। রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারকরা যতদিন এই নির্মম সত্য উপলব্ধি করে পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না করবেন, ততদিন ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে।
তাছাড়া অর্থের বিনিময়ে পদায়ন বা বদলির সংস্কৃতি বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। যখন কোনো কর্মকর্তা বিপুল অর্থের বিনিময়ে পদায়ন পান, তখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সেই অর্থ মুনাফাসহ তুলে নেওয়া। ফলে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রশাসনিক নৈতিকতাহীনতার কারণেই অনেক সময় গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো মেয়াদ শেষে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন কোনো সরকারই তা উপলব্ধি করতে পারে না।
বিনিয়োগ পরিবেশ আকর্ষক করার জন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবায়ন। প্রায়শই দেখা যায়, এক সরকারের আমলে গৃহীত দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নীতি বা সুবিধা অন্য সরকারের আমলে এসে স্থগিত বা পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই ধরনের অনিশ্চয়তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থার সংকট তৈরি করে। বিনিয়োগকারীরা একটি স্থির ও দীর্ঘমেয়াদী নীতি কাঠামোর প্রত্যাশা করেন। তাই সরকারি সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক নীতিমালায় স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উদ্যোক্তারা নির্ভয়ে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সুশাসন ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় লালফিতার দৌরাত্ম্য, দুর্নীতি এবং জবাবদিহির অভাব বিনিয়োগের গতিকে মন্থর করে দেয়। ওয়ান স্টপ সার্ভিস (OSS) বা দ্রুত সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও প্রায়শই ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন লাইসেন্স, অনুমোদন ও সেবা পেতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রশাসনকে সম্পূর্ণ জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ করে তুলতে হবে, যাতে দুর্নীতি বন্ধ হয় এবং সেবা সহজীকরণ বাস্তব রূপ লাভ করে।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো ও আধুনিক লজিস্টিকস সুবিধার উন্নয়ন অপরিহার্য। পরিবহন ব্যবস্থা, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) ব্যাহত হলে পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দ্রুত দূর করতে হবে।
বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অপার হওয়া সত্ত্বেও সুশাসন ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে খারাপ প্রভাব ফেলছে দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ঘাটতি। তবে এখানে একটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক গতি ফেরাতে নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি হলো, শীর্ষ নেতৃত্বের যে কাজের গতি ও সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার সঙ্গে আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনিক সহকর্মীরা অনেকক্ষেত্রে মিল রাখতে পারছেন না—বা রাখতে চাইছেন না। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন, জবাবদিহি এবং আইনশৃঙ্খলা সুরক্ষার মতো জায়গায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। মব জাস্টিস বন্ধ করা, ঘুষ ও চাঁদাবাজির মতো অরাজকতা কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে আমরা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছি, তা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সুতরাং এখানে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ প্রশাসন গঠন, অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে নিয়োগ-বদলি বন্ধ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং কঠোরভাবে আইনের শাসন প্রয়োগ করাই এখন সময়ের দাবি। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে স্বপ্ন দেশ দেখছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
