সরকারের ছয় মাস

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ১৯ সূচকে অবনতি- সিপিডি

ফন্ট সাইজ:

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতি কাক্সিক্ষত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সার্বিক অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভসহ ১২টি খাতে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু ঋণসহ বাকি ১৯টি 
গুরুত্বপূর্ণ সূচকে তীব্র অবনতি ও গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল রাজধানীর একটি মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। রাজনৈতিক সাহসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়টি উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়।

তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে আইন তৈরি হয়, আইন প্রয়োগ হয় ও আইনের নজরদারি হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সরকার দাঁড়াতে দেবে কিনা, এটাই বড় প্রশ্ন। পুরনো সরকারের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে কিনা, তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো- প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার রাজনৈতিকীকরণের দিকে নেয়া হচ্ছে কিনা। তার ভাষ্যে, ‘তারা যদি রাজনৈতিক পদায়ন করেন, তাহলে এর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা নিজেরাই।’
তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও আর্থিক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর রাখতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা না গেলে অন্যান্য সংস্কারও কার্যকর হবে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয় বলেও মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক সাহস দেখিয়ে নিজের দলের লোকজনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন কিনা এবং আমলাদের যথাযথ জায়গায় রাখতে পারেন কিনা, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন সরকারের প্রথম ৬ মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। একই সময়ে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারিয়েছে।

সিপিডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি। এ ঘাটতি সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। নিট বৈদেশিক সহায়তাও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বন্ধ ৯৫ কারখানা, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬২ হাজার: শিল্প খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে সিপিডি। জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ সময়ে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। এর প্রভাবে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে চলে গেছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলছে সিপিডি: সিপিডি’র মূল্যায়নে সরকারের কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক হিসেবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে- ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আরএমজি’র বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির সুপারিশ: সিপিডি সরকারের প্রতি অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশনসহ একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুত ও উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনেরও পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি: সরকারের রাজস্ব আদায় নিয়েও বড় উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়বে বলে মনে করছে সিপিডি।
ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ: দুর্বল ব্যাংক খাতও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সিপিডি’র মতে, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করা কঠিন হবে।

‘এ’ দিতে চাইলেও ‘বি’র দিকে যাচ্ছে: সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারকে ‘এ’ দিতে চাইলেও বাস্তবতা তাকে ‘বি’র দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কার্যক্রমে অনেক ‘নয়েজ’ থাকলেও কাক্সিক্ষত ‘মিউজিক’ পাওয়া যাচ্ছে নাÑ এমন মন্তব্যও করেন তিনি। সিপিডি’র নিজস্ব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিকে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত অর্জিত স্থিতিশীলতা ভঙ্গুর এবং বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে বাস্তবসম্মত রাজস্ব কাঠামো, সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করছে সিপিডি। আগামী দিনে এলডিসি থেকে উত্তরণ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে থাকায় বিচ্ছিন্ন ঘোষণা নয়, বরং সময়বদ্ধ সংস্কার বাস্তবায়নকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।