সরকারের বিরোধিতা হবে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক

সম্পাদকদের সঙ্গে জামায়াতের মতবিনিময়

সরকারের বিরোধিতা হবে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক

ফন্ট সাইজ:

দেশের শীর্ষ স্থানীয় প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলের আমীর ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার ২৯ মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় জামায়াতের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিভিন্ন দৈনিকের সম্পাদকরা বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার পরামর্শ দেন। একইসঙ্গে জনগণের দাবি নিয়েও সক্রিয় থাকার কথা বলেন। তবে অতীতের মতো সহিংস কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি না দেয়ার আহবান জানিয়েছেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারের সব ভালো কাজে তারা সহযোগিতা করবেন। জনস্বার্থ বিরোধী কাজে নিয়তান্ত্রিক পন্থায় প্রতিবাদ করা হবে। গণতান্ত্রিকভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে গণমাধ্যমেরও সহযোগিতা কামনা করেন জামায়াত আমীর।

গতকাল বেলা ১২টায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের আমন্ত্রণে মতবিনিময় সভায় দেশের প্রায় সব শীর্ষ স্থানীয় প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকরা অংশ নেন।
মতবিনিময় সভা শেষে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জাতীয় সমস্যা, জনদুর্ভোগ, জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি সংকট, সংসদে জামায়াতে ইসলামী তথা ১১ দলীয় ঐক্যের ভূমিকা এবং বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে নীতি, তা আমাদের আমীর সংসদের ভেতরে-বাইরে বলে আসছেন। আমরা একটি দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবো। প্রচলিত প্রথাগত বিরোধী দলের রাজনীতিতে যে খারাপ ঐতিহ্য ছিল, তা ভেঙে দেশের স্থিতিশীলতা, রাজনীতি ও গণতন্ত্রের উত্তরণে ভালো কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবো। সব মন্দ ও জনস্বার্থবিরোধী কাজে প্রতিবাদ করবো।

এই নীতি সম্পাদকদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্পাদকদের মধ্য থেকেও জামায়াতের এই পার্লামেন্টারি পলিসিকে প্রশংসা করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, গঠনমূলকভাবে দেশকে স্থিতিশীল রেখে সরকারকে বিরোধিতার জায়গায় বিরোধিতা এবং সহযোগিতার জায়গায় সহযোগিতা করে একটি বিরোধী দল যে বৃহৎ ভূমিকা পালন করতে পারে, এটি আমরা প্রথম দেখতে পাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সম্পাদকদের সঙ্গে আমীরে জামায়াতের প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় হয়েছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্পাদকরা পরামর্শ দিয়েছেন-আপনারা বিরোধিতা করবেন গঠনমূলকভাবে, আলোচনা করবেন এবং জনগণের দাবি নিয়ে প্রয়োজন হলে রাজপথেও থাকবেন। তবে আগের বিরোধী দলের মতো অসহিষ্ণু, অস্থিতিশীল বা সহিংস কোনো পথে গিয়ে দেশকে আর অস্থিতিশীল করবেন না।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমাদের নেতা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা প্রথমবারের মতো জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে প্রকাশ্যে ও খোলামেলাভাবে মতবিনিময় করেছেন। সম্পাদকরা এতে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তারা বলেছেন, এ ধরনের সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে তারা নিজেদের মতামত দিতে পারবেন।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের এমপিদের সঙ্গে বৈষম্য, উন্নয়নকাজে বরাদ্দ ও বণ্টন, সংসদের ফ্লোরে কথা বলার সুযোগ, আইন প্রণয়ন ও বিভিন্ন নোটিশ গ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে- এসব বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, গণভোটের গণরায় কার্যকর করা, দ্রব্যমূল্য, প্রবাসীদের অধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াত সংসদে কী ভূমিকা পালন করেছে, তা দলের আমীর সম্পাদকদের সামনে তুলে ধরেছেন।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, জাতীয় সংসদে অতীতে বিরোধী দল কীভাবে দেশকে অস্থিতিশীল ও সংসদকে অকার্যকর করেছে, সম্মানিত সম্পাদকরা সেই ইতিহাস স্মরণ করেছেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান যে ব্যতিক্রম, সেটিও তারা প্রশংসা করেছেন। আমরা সংসদকে কার্যকর রাখতে চাই।

মতবিনিময় শেষে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা মিডিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন এবং তিনি বলেছেন যে, তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চান। সেই সঙ্গে তারা কিছু কিছু ব্যাপারে তাদের মনোকষ্টের কথা জানিয়েছেন। যেমন তারা জ্বালানি সংকট নিয়ে একটা বিশেষ অধিবেশন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাতে সাড়া পাননি। তারপরেও তারা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা এবং পার্লামেন্টের সকল কর্মকাণ্ডের মূল জায়গা করতে চান। এজন্য সহযোগিতা চেয়েছেন। মাহমুদুর রহমান বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, তাদের ভুল হলে যেন আমরা ধরিয়ে দিই এবং পরামর্শ দিই। তিনি আমাদের সঙ্গে নিয়মিত বসতে চান।
তিনি বলেন, আমরা সম্পাদকদের পক্ষ থেকে বলেছি যে, জুলাই বিপ্লবের পরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছে, মিডিয়ার স্বাধীনতা ফিরে এসেছে। আমরা বলেছি যে, আমাদের কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকবে না, আমরা প্রথমসারির মিডিয়াগুলো প্রফেশনালি দায়িত্ব পালন করব ইনশাআল্লাহ।

প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খান বলেন, আমি তাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি- এদেশে আমরা একটি পর্যায় অতিক্রম করে এসেছি, সেটি হচ্ছে ফ্যাসিবাদী পর্যায়। একইভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলে বিরোধী দলের নামে নৈরাজ্য এবং আন্দোলনের নামে অরাজকতার পর্যায়ও আমরা অতিক্রম করেছি। এখন গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চায় থাকতে হবে এবং সরকার পরিবর্তনের একমাত্র পথ হতে হবে নির্বাচন। আমরা যেন আবার ফ্যাসিবাদ কিংবা বিরোধী দলের নামে নৈরাজ্য কোনোটিরই পুনরাবৃত্তি না ঘটাই, সেই আহ্বানই আমরা জানিয়েছি।

এসময় ডেইলি ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, আজকের বৈঠকে কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল না। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর নেতৃস্থানীয় সম্পাদকদের তার বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মূলত একটি মতবিনিময়ের জন্য। সম্পাদকরা খোলামেলাভাবে বিরোধী দলের বর্তমান ভূমিকা, তাদের করণীয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকৌশল নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শ দেন।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন- যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, প্রথম আলো’র নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ডেইলি ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম, আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন, প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খান, খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল, কালবেলা’র সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সময়ের আলো’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আজকের পত্রিকা’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান, বাণিজ্য প্রতিদিনের সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন, মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।

মতবিনিময় অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আব্দুল হালিম, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন , ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির মো. নুরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।