রংপুর শহরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা চলছে। গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো-রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩)।
প্রথম দিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে পুলিশের ধারণা ছিল, এটা ডাকাতি। তবে রোববার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়ায় হত্যা করা হয় তাদের। মর্মান্তিক এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম।
সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোর এ সংক্রান্ত এক খবরে বলা হয়, পুলিশের এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই শিক্ষকের স্বজনেরা। ‘রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যা: খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন।
হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের ভাষ্য পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। দেখতে পেয়ে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে হত্যা করা হয় তাঁদেরও। এরপর ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
গণপতির পরিবারের সঙ্গে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দুজন মিলে একে একে পরিবারটির চার সদস্যকেই হত্যা করেন। মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তাঁরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আর যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন। গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ইয়াবা সেবন করার সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি গয়নার দোকানে প্রায় আট বছর কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।
‘পুলিশ যা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়’
তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।’
এ ঘটনায় গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। মামলার পর এর আগে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা, তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে।’
দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাঁদের পরিবারও। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’
জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আজ (গতকাল) ভোরে আটক করা হয়। পরে তাঁরা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’
একেক জায়গায় পড়ে ছিল লাশ
পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। এরপর শনিবার ফোন দিলে বোন, জামাতা ও বোনের মেয়ে—সবার নম্বর বন্ধ পান। কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে ওই বাসায় যান। কারও সাড়া না পেয়ে পাশের একটি ভবনে উঠে জানালার কাচ ভেঙে ঘরের জিনিসপত্র অগোছাল দেখতে পান। এরপরই খবর দেন পুলিশকে। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে রাত ১১টার দিকে। দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ লাশ চারটি উদ্ধার করে বাড়িটি থেকে নিয়ে যায়।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। গামছা প্যাঁচানো ছিল তাঁর গলায়।
‘কোথায় বাস করছি আমরা’
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণপতি আগে রংপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০১০ সালে কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন সেখানে।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে লোকজনের ভিড়। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি তিনতলা ভবনেরও নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন হিমাংশু রায় নামের অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষক। হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, কিছুই বুঝতে পারেননি।
বোন, জামাতা ও বোনের ছেলে–মেয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। বাড়িতেও একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন নেই—সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শত্রুও নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই!’
‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় এই হত্যা!’—এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে দৈনিক ইত্তেফাক। প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুর নগরীতে বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত একই এলাকার দুই তরুণকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে। হত্যার পর তারা ঐ বাড়িতেই গোসল করে এবং শসা ও খেজুর খায়। এরপর তাদের কাছে থাকা ইয়াবা তারা ঘটনাস্থলেই সেবন করে। রাত যাপন শেষে পরদিন দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
গতকাল রবিবার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি জানান, গতকাল ভোরের দিকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে দুই জনকে আটক করা হয়। এরা হলেন:নগরীর কোতোয়ালি থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়া এলাকার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে এবং মুগ্ধ একটি মাছের দোকানে কাজ করতেন। তারা দুজনে সম্পর্কে মামাতো ও খালাতো ভাই। এদিকে একই পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শহরে মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য: রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের ভবন দেবু দাসের। সেই ভবন দিয়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতির বাড়ির ছাদে উঠে আসে। সেখানে বসে ইয়াবা সেবনের এক পর্যায়ে শব্দ পেয়ে ছাদে আসেন শিক্ষক গণপতি। তিনি ঘাড়ে গামছা নিয়ে ছাদে আসেন। তাদের দেখে ইয়াবা সেবনের ব্যাপারে প্রশ্ন করায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাত্ক্ষণিক গণপতির ঘাড়ের গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হত্যার সময় গোঙানির শব্দ শুনে গণপতি স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করে। এ সময় তারা সিঁড়িতেই প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করে। প্রীতিলতার চিত্কারে সিঁড়ির দিকে তার মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এতেও সে মারা না গেলে রশি এনে তার গলায় ও মুখে পেঁচিয়ে জোরে টান দেয় তারা। এতে আগামীর মুখের চোয়াল ভেঙে যায়। এরপর শিশু প্রিয়মের ঘরে এসে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। চিনে ফেলতে পারে এমন শঙ্কায় প্রিয়মকে ঘুমন্ত অস্থায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। একে একে চার জনকে হত্যার পর তারা দুই জনেই শরীরের উত্তেজনা কমাতে গোসল করে। পরে দুজনে ডাইনিং টেবিলে বসে শসা, খেজুর ও ইয়াবা সেবন করে। হত্যার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে তারা বাড়ির আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে এবং স্বর্ণের গহনা আগুন দিয়ে পরীক্ষা করেন, সেটি আসল না নকল। পরে বাকি রাতটুকু চেয়ারে বসে বিশ্রাম নেয় হত্যাকারীরা। বাড়িতে থেকে বের হওয়ার সময় যাতে কেউ দেখে না ফেলে এজন্য তারা অপেক্ষা করতে থাকে। এরই মধ্যে ঐ বাড়িতে ব্যবহূত দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডারের পানিতে ভিজিয়ে রাখে যাতে মোবাইলে কোনো আঙুলের ছাপ না থাকে। শুক্রবার জুমার নামাজ শুরু হওয়ায় রাস্তা ফাঁকা দেখে তারা ঐ বাড়ি থেকে সটকে পড়ে।
‘স্যার’ চিনে ফেলায় খুন পুরো পরিবার—শিরোনামে দৈনিক যুগান্তরের খবরে বলা হয়, জনবহুল এক পাড়া। গায়ে গা লাগানো বাড়িঘর। পাশেই খেলার মাঠ। দিনভর মানুষের আনাগোনা। এমন এক পরিবেশেই রংপুর নগরের কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় বাড়ির ভেতর বৃহস্পতিবার রাতে খুন হন একই পরিবারের চারজন-অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছোট ছেলে প্রীয়ম। অথচ দেওয়ালের ওপারে থাকা প্রতিবেশীদের কেউ টের পাননি। লাশ পড়ে থাকে প্রায় দুই দিন; পচনের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে শনিবার মধ্যরাতে লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ বলছে, খুনিরা অচেনা কেউ নয়। এই বাড়িরই পরিচিত দুই তরুণ, যারা গণপতিকে ডাকতেন ‘স্যার’ আর তার স্ত্রীকে ‘কাকি’। ছাদে বসে ইয়াবা সেবনের সময় বাধা দেওয়া এবং পরিচয় ফাঁসের ভয়েই তারা একে একে শেষ করে দেয় গোটা পরিবারকে।
এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
পুলিশ কমিশনার জানান, মাছুয়াপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫)। আসামিরা প্রথমে এক বাড়িতে ইয়াবা সেবন করেন। পরে ছাদ টপকে আসেন গণপতির বাড়ির ছাদে। সেখানে আরেক দফা ইয়াবা সেবন করতে করতে আড্ডা দিচ্ছিলেন। শব্দ শুনে গামছা গায়ে দিয়ে দেখতে যান গণপতি। চিনে ফেলেন দুজনকে, বাধা দেন মাদক সেবনে। পরিচয় প্রকাশ হওয়ার ভয়ে গলায় সেই গামছা প্যাঁচিয়েই তাকে হত্যা করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। গণপতির চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। পরে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১২ বছরের প্রীয়ম চক্রবর্তীকেও বালিশ চাপা দিয়ে খুন করে তারা। প্রিয়মের সঙ্গে এলাকায় খেলাধুলা করত ঘাতক সিদ্ধার্থের ছোট ভাই।
পুলিশের ভাষ্য, আগামী চক্রবর্তীকে হত্যার সময় চার/পাঁচ মিনিট ধরে তার প্রাণ যাচ্ছিল না। তখন খুনিরা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ প্যাঁচিয়ে ভীষণ জোরে টান দেয়। এতে তার চোয়ালের হাড় ভেঙে যায় এবং তার চোখ বেরিয়ে আসে। পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন। আর সিদ্ধার্থ দাস একটি জুয়েলারি দোকানে প্রায় আট বছর ধরে কারিগর হিসাবে কাজ করছেন। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই।
পুলিশ কমিশনার বলেন, বাড়ির সবাইকে একে একে সবাইকে হত্যার পর সকালের দিকে গোসল করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। এরপর ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা খান তারা। পরে আরেক দফা ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমা হওয়ায় রাস্তায় লোকজন কমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন দুজন। এর মধ্যে ঘটনাটি ডাকাতি হিসাবে দেখানোর উদ্দেশ্যে ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করেন। সঙ্গে নেন কিছু স্বর্ণালংকার। দুপুরের দিকে ছাদে উঠে ফের টপকে পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে নেমে চলে যান দুজন। স্বর্ণালংকারগুলো এলাকার মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে দেন।
পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে শিরোনাম করেছে দৈনিক সমকাল। ‘নেশা করতে বাধা দেওয়ায় স্বামী- স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা: পুলিশ’। এই শিরোনামের খবরে বলা হয়, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনার নতুন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, নেশা করতে বাধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক দুজন জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার দুপুরে রংপুর কোতোয়ালি থানায় সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের। আটক দুজন হলো, মুগ্ধ দাস (২৫) ও সিদ্ধার্থ দাস (২৮)। তারা একই এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠে নেশা করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। বিষয়টি টের পেয়ে গণপতি ছাদে গিয়ে তাদের নেশা করতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ওই দুজন শিক্ষকের ঘরে ঢুকে তাঁকে ও পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করেন। পরে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে চলে যায়।
ওসি নাজমুল কাদের বলেন, আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে।
এর আগে শনিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে রংপুর নগরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
পুলিশ ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় পরিবারের চার সদস্য বসবাস করতেন। প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ চলছিল।
‘রহস্যঘেরা’ উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করেছে দৈনিক দেশ রূপান্তর। ‘রংপুরে রহস্যঘেরা চার খুন নিশ্চিহ্ন শিক্ষক পরিবার’—শিরোনামে ওই প্রতিবেদেন বলা হয়, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে গত শনিবার রাতে তালাবদ্ধ একটি ভবন থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ভবনটির প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।
এই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে ঘটনাটি ঘটেছে বলে পুলিশ দাবি করলেও অনেকে এটা মানতে নারাজ। তাদের মতে ঘটনাটি আরও বিস্তারিত তদন্তের দাবি রাখে। কথিত এই ইয়াবা সেবনকারীদের শিক্ষকের বাড়িতে প্রবেশ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে।
নিহতরা হলেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১৩)। রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী পরিবার নিয়ে বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন।
এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যার পর খুনিরা শরীরের উত্তেজনা কমাতে শষা ও খেজুর খায়। এরপর তারা সেখানে ইয়াবা সেবন করে। গতকাল রবিবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ জানান মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। এর আগে ভোরের দিকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বাড়ি মাছুয়াপাড়ায়। তারা দুজনে সম্পর্কে মামাতো ও খালাতো ভাই। সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানে কাজ করত এবং মুগ্ধ মাছের দোকানে কাজ করত।
গত তিন দিন ধরে বাড়িটি তালাবদ্ধ দেখতে পায় এলাকাবাসী। এলাকাবাসী জানায়, কয়েক দিন ধরে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না পেরে ওই শিক্ষকের আত্মীয়স্বজন এলাকায় এসে বাড়িতে তালাবদ্ধ দেখে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তী, সিঁড়ির কাছে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় এবং একটি কক্ষের ভেতরে খাটের নিচ থেকে তাদের ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন এবং বাড়ির জিনিসপত্র তছনছ ও ছড়ানো-ছিটানো ছিল।
পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল, এটা গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলেন। ইয়াবা সেবনের কথা প্রকাশের ভয়ে তারা গণপতি চক্রবর্তীকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে গামছা পেঁছিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার সময় গোঙানির শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদের ওপর ওঠার চেষ্টা করেন। এমন সময় তারা সিঁড়িতে প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গলায় রশি পেঁছিয়ে হত্যা করে। মাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী। তারা তাকেও রশি পেঁছিয়ে হত্যা করে। খুনি দুজনই একই এলাকার হওয়ায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম তাদেরকে আগে থেকেই চেনে এবং জানে। খুনের বিষয় যাতে কেউ টের না পায় এ জন্য আয়ুসকেও রশি পেঁচিয়ে ও পরে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে।
‘বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যাকাণ্ড: পুলিশ’—শিরোনামে কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়, রংপুর নগরীর কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়া। ওই পাড়ার একটি বাড়িতে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই তরুণকে আটক করেছে পুলিশ।
ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন তাঁরা। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়। গতকাল রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তাঁর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। প্রথমে স্বামী, এরপর স্ত্রী, তারপর মেয়ে ও সবশেষে ১২ বছরের পুত্রসন্তানকে হত্যা করেন ঘাতকরা।
এর মধ্যে কাউকে গামছা পেঁচিয়ে, কাউকে কাপড় দিয়ে বেঁধে, আবার কাউকে রশি পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পুত্রসন্তান প্রিয়মকে হত্যা করা হয় বালিশ চাপায়। এভাবে কিছু সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে হত্যার শিকার হয়েছে রংপুর মহানগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়ার (দাসপাড়া) বাসিন্দা ও রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। ঘাতকদের নির্মম নৃশংসতায় একটি পরিবার পুরো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
পুলিশের ভাষ্য, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গণপতি চক্রবর্তীর দুই প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামের দুই ঘাতককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে খোয়া যাওয়া স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে।
এই ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপিনাত চক্রবর্তী বাদী হয়ে গতকাল দুপুরে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত ১টার পর তিনি তাঁর বোন ও বোন জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন।
জানান তিনি। এক পর্যায়ে শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মাছুয়াপাড়ায় আসেন। বাসার বড় গেট বন্ধ পেয়ে পাশের বাসা দিয়ে প্রবেশ করেন।
তিনি বলেন, ‘বাসার নিচতলায় কাজ চলছিল। ওপরতলায় বোন জামাইরা থাকতেন। নিচতলার গেট বন্ধ থাকায় দেয়াল টপকে ওপরে উঠে জানালায় জোরে জোরে আঘাত করলে জানালা খুলে যায়, কিন্তু জানালার পাশে পর্দা এবং বিছানায় মশারি টানানো ছিল। কেউ ডাক শুনছে না। বিষয়টি সন্দেহ হলে ৯৯৯ ফোন করি। এরপর কোতোয়ালি থানায় জানালে পুলিশ বাসার নিচতলার দরজা ভেঙে প্রবেশ করে একের পর এক লাশ দেখতে পায়।’
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা কালের কণ্ঠকে জানায়, বাসার ছাদে পড়ে ছিল প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগমনি প্রার্থী চক্রবর্তীর লাশ। বাসার চিলেকোঠায় পড়ে ছিল গণপতি আর শোবার ঘরের এক কোণে ওয়াল ঘেঁষে পড়ে ছিল প্রিয়ম চক্রবর্তীর লাশ। পুরো বাসা তছনছ করা ছিল। আলমারি, টেবিলের ড্রয়ার খুলে এলোমেলো করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ও সিআইডির সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করেন। সেখানে ইয়াবা সেবনের উপকরণ ও ডাইনিং টেবিলে শসা ও খেজুর খাবার আলামত পাওয়া গেছে।
‘নিহত শিক্ষকসহ ৪ জনের মুখই ছিল ঝলসানো, নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ’—শিরোনামে দ্য দৈনিক ডেইলি স্টারের খবরে বলা হয়, রংপুর নগরীতে নিহত অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্যের মুখই ঝলসানো ছিল। তাদের মুখমণ্ডল থেকে দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে।
পুলিশের ধারণা, হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে তাদের মুখ ঝলসে দেওয়া হয়েছিল। গতকাল শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)।
আজ রোববার সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মরদেহগুলো দাহ করতে দখিগঞ্জ শ্মশানে নেওয়া হলে স্বজনেরা চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো দেখতে পান।
প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী ডেইলি স্টারকে বলেন, সন্ধ্যায় মরদেহগুলো হস্তান্তরের পর আমরা দেখতে পাই, তাদের মুখগুলো ঝলসানো। এর আগে পুলিশ আমাদের মরদেহের কাছে যেতে দেয়নি।
‘তাদের হত্যার আগে বা পরে দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে মুখগুলো ঝলসে দেওয়া হয়েছিল। এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’, তিনি বলেন। রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের ডেইলি স্টারকে বলেন, নিহতদের মুখমণ্ডলে দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ‘রংপুরে হিন্দু পরিবার হত্যার কিনারা, নেশায় বাধা পেয়ে খুন! খেজুর-শসা খায় আততায়ীরা’ এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে ভারতের আরেক গণমাধ্যম সংবাদ প্রতিদিন।
সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সপরিবারে খুন! ঘটনা প্রকাশ্যে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার কিনারা করে ফেলল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দু’জনকে গ্রেপ্তার করে প্রকৃত ঘটনা জানা গিয়েছে। রংপুর মহকুমা পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, ধৃতরা মাছুয়াপাড়ার মুগ্ধ দাস ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। ধৃতদের জেরা করে পুলিশ জানতে পারে, নিহত শিক্ষকের বাড়ির ছাদে উঠে রাতে নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবা সেবন করছিল তারা। বাধা পেয়ে চক্রবর্তী পরিবারের সকলকে খুন করে। হত্যাকাণ্ডের পর নিজেরা স্নান করে ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর, শসাও খায়। তারপর সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায়।
রবিবার দুপুরে নিজের কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে সবটা জানিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মহম্মদ আবদুল মাবুদ। ধৃতরা একই এলাকা, মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা। সিদ্ধার্থ স্থানীয় এক গয়নার দোকানে এবং মুগ্ধ সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে কাজ করে। পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ মাদক কারবারির কাছ থেকে নিষিদ্ধ ইয়াবা কিনে সীমান্ত নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাসায় সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে তারা নিহত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায়। সেখানে ইয়াবা সেবন করছিল সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
সেসময় শব্দ পেয়ে গণপতিবাবু ছাদে যান, বাধা দেন। তাতেই রাগের মাথায় অভিযুক্তরা গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করে। শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে উঠতে গেলে সময় সিঁড়িতে তাঁকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করতে গামছার পাশাপাশি গলা ও বুকে দড়ি পেঁচিয়ে টেনে দেওয়া হয়। এতে তার চোয়াল এরপর ভেঙে যায়।এরপর গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে তাকেও হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই বাড়ির বাথরুমে গিয়ে স্নান করে। পরে ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর ও শসা খায়। এরপর সেখানে আরও একবার ইয়াবা সেবন করে তারা। পুলিশ সূত্রে আরও খবর, দুটি স্মার্টফোন থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সম্ভাব্য প্রমাণ মুছে ফেলতে তারা ডিটারজেন্ট মিশ্রিত জলে মোবাইল দুটি চুবিয়ে রাখে। এছাড়া ওই বাড়ি থেকে লুণ্ঠিত সোনার গয়না আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা সেরে সেসব নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখে। মন্দিরের পিছনে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে সোনার গয়না লুকিয়ে রাখে। পুলিশ তা উদ্ধার করেছে।
ভারতের গণমাধ্যম এই সময় তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। হালকা একটি শব্দ কানে আসে গণপতির। শব্দ অনুসরণ করে ছাদে গিয়ে দেখেন দুই যুবক বসে মাদক সেবন করছে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার শুরু করেন গণপতি। গলায় যে গামছা পরে তিনি ছাদে গিয়েছিলেন, তা পেঁচিয়েই হত্যা করা হয় গণপতিকে। প্রাথমিক তদন্তে অন্তত পুলিশ এমনটাই জানতে পেরেছে। পুলিশের দাবি, দুষ্কৃতীরা পালিয়ে যায়নি। নীচে নেমে এক এক করে বাড়ির বাকি সদস্যদেরও ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে তারা। বাংলাদেশের রংপুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কিনারা করে এমনটাই জানিয়েছে রংপুর মহানগর পুলিশ।
দুই দুষ্কৃতী ২৩ বছরের মুগ্ধ দাস ও ১৯ বছরের সিদ্ধার্থ দাসকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এক পরিবারের চার জনকে খুন করার এই হাড়হিম করা ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন রংপুরের পুলিশ কমিশনার মহম্মদ আবদুল মাবুদ। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়তে দেখা যায় পুলিশ কমিশনারকে।
শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল। ডাকাতির উদ্দেশ্যে চার জনকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা ছিল পুলিশের। তবে রবিবার একটি সাংবাদিক বৈঠক করে পুলিশ কমিশনার মহম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানেই তারা মাদক সেবন করছিলেন। তাদেরকে দেখে ফেলার কারণেই প্রথমে গণপতিকে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, পরে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে, ছেলেকে মেরে ফেলা হয়। কারও দেহ উদ্ধার হয় সিঁড়ি, কারও খাটের তলায়।
তবে পুলিশ জানিয়েছে,, হত্যা করে ওই দুই যুবক বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাননি। তারা দু’জনেই ওই বাড়িতে কিছুক্ষণ সময় কাটান। বাড়ির বাথরুমে স্নান করেন। খেজুর ও শসা খেয়ে তাদের কাছে থাকা বাকি মাদক সেবন করে। এর পরেই হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি দেখানোর জন্য ঘরের জিনিস এলোমেলো করে দেওয়া হয়। এমনকী, প্রমাণ নষ্ট করার জন্য পরিবারের দু’টি মোবাইলকে ডিটারজেন্ট মেশানো জলে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল।
জানা গিয়েছে, তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকতেন। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ এখনও চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর মৃতদেহ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। আর তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। তাঁর গলায়ও গামছা প্যাঁচানো ছিল।
তল্লাশির সময়ে পুলিশ লক্ষ্য করে বাড়ি থেকে টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও মুঠোফোন-সহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে যায়নি দুষ্কৃতীরা। তবে সেখান থেকেই সন্দেহ বাড়ে পুলিশের। মাছুয়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ রবিবার ভোরে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে। মুগ্ধ দাস শহরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন। দু’জন সম্পর্কে মামাতো ভাই।
