চার সেশনে ৭৫০ বলের নাটকীয় লড়াই শেষে ম্যাকাই টেস্টে পরাজয়! তাতেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ ড্র। যা দেশের ক্রিকেটে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৮৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া অজিদের ঐতিহ্যে এমন কীর্তি গড়া বাংলাদেশের জন্য এক অবিশ্বাস্য অর্জন। ম্যাকাই টেস্টে গতকাল অজিদের কাছে ইনিংস ও ৫১ রানে হেরে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। সফরটি ১-১ সমতায় শেষ হলো। তবে এই হারের পরও অজিদের মাটিতে লাল-সবুজের দল রচনা করলো অনন্য এক ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার ১৪৯ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে সফরকারী মাত্র সাতটি দল টেস্ট সিরিজ ড্র করতে সক্ষম হয়েছে। এই তালিকায় এশিয়ার দল রয়েছে তিনটি।
এতদিন কেবল ভারত ও পাকিস্তানের এই গৌরব ছিল। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিতীয় টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়ে সেই রেকর্ডে যুক্ত হলো বাংলাদেশের নাম। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় বাঙলাদেশ। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে বাজে ব্যাটিংয়ের খেসারত দিয়ে মলিন হার দেখে সফরকারীরা। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত গর্বের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করে বলেন ‘আমরা এত বছর পর এসে (২৩ বছর পর) এমন একটা রেজাল্ট করলাম (সিরিজ ড্র)। এশিয়ান দল হিসেবে আমাদের এমন পারফরম্যান্সের পর আশা করি অস্ট্রেলিয়া আমাদের দ্রুত আবার তাদের দেশে খেলার আমন্ত্রণ জানাবে।’
গতকাল দ্বিতীয় দিনে আট উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে মাঠে নেমে ২১০ রানে থামে অস্ট্রেলিয়া। ১৪৬ রানে পিছিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে খেলতে নেমে অজিদের গতি আর বাউন্সের তোপে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন। প্রথম ওভারেই মিচেল স্টার্কের বলে বিদায় নেন সাদমান ইসলাম। পরের বলে বোল্ড হন মুমিনুল হক। ৯ রান করা তানজিদ হাসান দ্রুত ফিরলে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন শান্ত ও অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহীম। তবে ৩১ রান করে শান্ত বাজে শটে ক্যাচ দিলে নামে বিপর্যয়। একে একে শূন্য রানে লিটন দাস ও এক রানে মেহেদী হাসান মিরাজ বিদায় নেন। এক প্রান্তে মুশফিকুর রহীম ২৯ রানে অপরাজিত থাকলেও দল ৯৫ রানে গুটিয়ে যায়। নিজের ও দলের দায়িত্ববোধ নিয়ে অধিনায়ক শান্ত বলেন, ‘দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা আরেকটু ভালো ব্যাটিং করতে পারতাম, তবে উইকেটটা কঠিন ছিল, মানতেই হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই কিছু বাজে শট ছিল, আমি কারও ওপর আঙুল তুলতে চাই না, কারণ দল হিসেবে আমরা ভালো ব্যাটিং করিনি। আমার নিজের কথা বলতে পারি, সেট হয়ে যেভাবে আউট হয়েছি তা গ্রহণযোগ্য নয়।’ বল হাতে স্টার্ক ৩৯ রানে চারটি এবং প্যাট কামিন্স ১০ রানে তিন উইকেট নেন।
ম্যাচের এমন ফলের মাঝেও রূপকথার নায়ক ছিলেন বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। মাত্র ৪৮ রানে সাত উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১৪৩ বছরের ইতিহাস নতুন করে লেখেন। প্রথম ইনিংসে অজি ব্যাটার ক্যামেরন গ্রিন ৬৭ রান করে শরিফুলের শিকার হন। অন্য পেসার হাসান মাহমুদ ৬৭ রান দেন। তাসকিন আহমেদ, মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম একটি করে উইকেট পান। বোলারদের বীরত্বে বিশ্বমঞ্চে রচিত হলো নতুন এক জয়ের কাব্য। সিরিজে ১-১ সমতা রাখার ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সে আইসিসি টেস্ট র?্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবারের মতো ছয় নম্বরে উঠেছে বাংলাদেশ। র?্যাঙ্কিংয়ের বিশ্বজয়ী উন্নতি ও অর্জন নিয়ে রোমাঞ্চ প্রকাশ করে অধিনায়ক শান্ত বলেন ‘প্রাপ্তি অনেক, ডাগআউটে বসে বা ফিল্ডিং করার সময় মনে হচ্ছিল, সত্যিই আমরা বিশ্বমানের একটা দলকে হারিয়েছি, নিউজিল্যান্ডের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জেতার এই রেকর্ড টেস্ট ক্রিকেটে বিশাল এক মাইলফলক, র?্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবারের মতো ৬ নম্বরে উঠে আসা অনেক বড় একটা অর্জন।’
আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত মোট ১০টি টেস্ট সিরিজ ড্র করেছে। এর মধ্যে দেশের মাটিতে ছয়টি এবং বিদেশের মাটিতে ড্র হয়েছে চারটি সিরিজ। ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ে, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ড্র’র গৌরব রয়েছে। পরবর্তীতে দেশের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আরও একটি সিরিজ ড্র করে লাল-সবুজ বাহিনী। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের মাঠে জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ ড্রয়ের কীর্তি ছিল। এবার ক্যাঙ্গারু ডেরায় ১-১ সমতায় সিরিজ শেষ করে বিদেশের মাটিতে চার নম্বর সিরিজ ড্রয়ের নতুন অধ্যায় যুক্ত করলো টাইগাররা। মহাকাব্যিক এই সফর শেষে অধিনায়ক শান্ত প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন ‘এশিয়ান দল হিসেবে আমাদের এমন পারফরম্যান্সের পর আশা করি অস্ট্রেলিয়া আমাদের দ্রুত আবার তাদের দেশে খেলার আমন্ত্রণ জানাবে।’ আগামী অক্টোবরে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। এরপর নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে কঠিন পরীক্ষায় নামবে।
