চিকিৎসা বিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই): বিলাসিতা নয়, সময়ের অপরিহার্য বাস্তবতা

চিকিৎসা বিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই): বিলাসিতা নয়, সময়ের অপরিহার্য বাস্তবতা

ফন্ট সাইজ:

একসময় চিকিৎসকের হাতে ছিল স্টেথোস্কোপ, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র এবং অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। এরপর চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুক্ত হয় এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি এবং জিনগত পরীক্ষা। প্রতিটি প্রযুক্তিই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করেছে।
আজ আমরা আরেকটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)।
অনেকে মনে করেন, এআই চিকিৎসকদের প্রতিস্থাপন করবে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এআই চিকিৎসকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং এটি একজন দক্ষ চিকিৎসকের সবচেয়ে শক্তিশালী সহকারী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলেছে, স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের উদ্দেশ্য মানুষের বিকল্প তৈরি করা নয়; বরং রোগীর কল্যাণ, চিকিৎসার মানোন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিয়েছে যে এআই অবশ্যই মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করতে হবে।
এআই কী?
সহজ ভাষায়, এআই হলো এমন একটি কম্পিউটার প্রযুক্তি, যা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে শেখে, তুলনা করে, সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পরামর্শ দেয় এবং মানুষের মতো কিছু জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ সম্পাদনে সক্ষম হয়।
তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-
এআই নিজে চিকিৎসা দেয় না, অস্ত্রোপচার করে না, রোগীর ব্যথা অনুভব করে না এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেয় না।
এআই তথ্য বিশ্লেষণ করে; সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসক।
কেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই এখন অপরিহার্য?
১. দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি প্রবাদ রয়েছে—
“সঠিক রোগ নির্ণয়ই অর্ধেক চিকিৎসা।”
আজ পৃথিবীতে প্রতিদিন কোটি কোটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য তৈরি হচ্ছে। একজন চিকিৎসকের পক্ষে সব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা সব সময় সম্ভব নয়।
এখানেই এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বর্তমানে এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্লেষণ করতে পারে—
* ইসিজি
* বুকের এক্স-রে
* সিটি স্ক্যান
* এমআরআই
* ইকোকার্ডিওগ্রাম
* করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাম
* আইভিইউএস
* ওসিটি
* প্যাথলজি স্লাইড
* চোখের রেটিনার ছবি
ফলে রোগ অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে এবং চিকিৎসা শুরু করা যাচ্ছে দ্রুত।
২. হৃদরোগ চিকিৎসায় এক নতুন যুগ
কার্ডিওলজি বর্তমানে এআই ব্যবহারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
এআই এখন সহায়তা করছে—
* হার্ট অ্যাটাক দ্রুত শনাক্ত করতে
* অনিয়মিত হৃদস্পন্দন নির্ণয় করতে
* হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি মূল্যায়নে
* করোনারি ধমনীর সংকোচনের মাত্রা নির্ণয়ে
* স্টেন্টের সঠিক দৈর্ঘ্য ও ব্যাস নির্বাচন করতে
* জটিল চঈও পরিকল্পনা করতে
* চঈও-এর ফলাফল মূল্যায়নে
* পুনরায় ব্লক হওয়ার ঝুঁকি নির্ধারণে
ফলে চিকিৎসা আরও নির্ভুল, নিরাপদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হচ্ছে।
৩. ক্যান্সার শনাক্তকরণে নতুন সম্ভাবনা
ক্যান্সারের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যত দ্রুত রোগ ধরা পড়বে, তত বেশি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা।
এআই বর্তমানে-
* স্তন ক্যান্সারের ম্যামোগ্রাম
* ফুসফুসের সিটি স্ক্যান
* কোলন ক্যান্সারের এন্ডোস্কপি
* জরায়ুমুখের ক্যান্সার স্ক্রিনিং
* প্যাথলজি স্লাইড
বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চোখে ধরা না পড়া সূক্ষ্ম পরিবর্তনও এআই শনাক্ত করতে সক্ষম।
৪. ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা
একই রোগে আক্রান্ত দুই ব্যক্তির চিকিৎসা সব সময় এক রকম হয় না।
এআই রোগীর-
* বয়স
* ওজন
* লিঙ্গ
* জিনগত বৈশিষ্ট্য
* ডায়াবেটিস
* কিডনি রোগ
* লিভারের কার্যকারিতা
* পূর্বের ওষুধ
* অ্যালার্জি
* জীবনযাত্রা
সব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে চিকিৎসককে সহায়তা করে।
এটিই আধুনিক প্রিসিশন মেডিসিন।
৫. ওষুধ আবিষ্কারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
একটি নতুন ওষুধ বাজারে আনতে সাধারণত ১০–১৫ বছর সময় লাগে।
এআই এখন-
* সম্ভাব্য ওষুধের অণু নির্বাচন
* ওষুধের কার্যকারিতা পূর্বাভাস
* পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি মূল্যায়ন
* ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরিকল্পনা
অনেক দ্রুত করতে সাহায্য করছে।
৬. নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে এআই
আইসিইউ বা সিসিইউতে রোগীর অবস্থা মুহূর্তে পরিবর্তিত হতে পারে।
এআই একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে পারে—
* হৃদস্পন্দন
* রক্তচাপ
* অক্সিজেনের মাত্রা
* শ্বাস-প্রশ্বাস
* ল্যাব রিপোর্ট
* মনিটরের তথ্য
অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসক ও নার্সকে আগাম সতর্ক করতে পারে।
ফলে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়।
৭. চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক
চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিনিয়ত নতুন গবেষণা প্রকাশিত হচ্ছে।
প্রতি বছর লাখ লাখ বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।
একজন চিকিৎসকের পক্ষে সব পড়া সম্ভব নয়।
এআই সর্বশেষ গবেষণা, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন এবং রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য চিকিৎসার বিকল্প উপস্থাপন করতে পারে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বদা চিকিৎসকের।
৮. হাসপাতাল পরিচালনায় এআই
শুধু রোগ নির্ণয় নয়, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাতেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যেমন-
* জরুরি রোগী বাছাই
* শয্যা ব্যবস্থাপনা
* অপারেশন থিয়েটারের সময়সূচি
* ওষুধের মজুত নিয়ন্ত্রণ
* চিকিৎসা নথি তৈরি
* হাসপাতালের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন
এর ফলে সময় ও ব্যয় উভয়ই কমে।
৯. জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এআই
ভবিষ্যতের মহামারী মোকাবিলায় এআই একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
এআই সাহায্য করতে পারে-
* রোগের বিস্তার পূর্বাভাসে
* সংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণে
* টিকাদান কর্মসূচি পরিকল্পনায়
* স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণে
* স্বাস্থ্যসম্পদের সঠিক বণ্টনে
১০. চিকিৎসা গবেষণায় এআই
আগে একটি গবেষণাপত্র লিখতে মাসের পর মাস সময় লাগত।
এআই এখন-
* সাহিত্য পর্যালোচনা
* তথ্য বিশ্লেষণ
* পরিসংখ্যান
* গবেষণার সারসংক্ষেপ
* প্রমাণভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ
অনেক দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে।

এআই-এর সীমাবদ্ধতা
এআই যতই উন্নত হোক, কিছু কাজ কখনোই করতে পারবে না।
এআই-
* রোগীর কষ্ট অনুভব করতে পারে না।
* রোগীর চোখের ভাষা বুঝতে পারে না।
* পরিবারের উদ্বেগ উপলব্ধি করতে পারে না।
* মানবিক সহানুভূতি দেখাতে পারে না।
* নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
* শারীরিক পরীক্ষা করতে পারে না।
এই কারণেই চিকিৎসক সবসময় চিকিৎসাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন।
এআই ব্যবহারে সতর্কতা
এআই ব্যবহারের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে।
যেমন-
* ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত
* রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা
* তথ্যগত পক্ষপাত
* প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরতা
* আইনি ও নৈতিক জটিলতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই এআই ব্যবহারে ছয়টি মৌলিক নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে—মানবকল্যাণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়সংগত ব্যবহার, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সর্বদা মানব তত্ত্বাবধান।
বাংলাদেশের জন্য করণীয়
বাংলাদেশে এআই-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে হলে-
* চিকিৎসকদের এআই-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
* মেডিকেল শিক্ষায় এআই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
* নিরাপদ ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে।
* এআই ব্যবহারের জন্য জাতীয় নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করতে হবে।
* রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
* সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ধাপে ধাপে এআই প্রযুক্তি সংযুক্ত করতে হবে।
উপসংহার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; এটি চিকিৎসকের দক্ষতা, গতি ও নির্ভুলতা বাড়ানোর একটি শক্তিশালী সহায়ক। যে চিকিৎসাব্যবস্থা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবিকতার সমন্বয় ঘটাতে পারবে, সেই ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবাকে নেতৃত্ব দেবে।
অতএব, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই গ্রহণ করা এখন আর বিলাসিতা নয়-এটি সময়ের অপরিহার্য বাস্তবতা। তবে এই প্রযুক্তির প্রকৃত শক্তি তখনই কাজে লাগবে, যখন এটি মানবিক মূল্যবোধ, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং দক্ষ চিকিৎসকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহৃত হবে।

লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস(ডিএমসি) এমডি(কার্ডিওলজি),বিভাগীয় প্রধান-কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।