ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল স্রোতের মুখে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। রোববার দুপুরে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় বাঁধের একটি অংশ ভেঙে লোকালয়ে দ্রুত পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও নিম্নাঞ্চল। হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশে পানি ওঠায় যান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
পানি উন্নয়নবোর্ড জানায়, প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে ভারতের ত্রিপুরার চাকমা ব্যারেজের গেটগুলো খুলে দেয়ায় খোয়াই নদীর পানি প্রবল বেগে বাংলাদেশে ঢুকতে থাকে। এর ফলে খোয়াই নদীর পানি বাল্লা পয়েন্টে বিপৎসীমার ১শ ৩০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানির প্রবল তোড়ে সদর উপজেলার কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাধ আবারও ভেঙে যায়। এর আগে গত ৯ জুলাই রাতে একই এলাকার খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়। শত কোটি টাকার মৎস সম্পদ নস্ট হয়। তলিয়ে যায় হাজার হাজার একর ফসলি জমি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ ভাঙনের পর প্রায় ৪৩ দিন পার হলেও বাঁধ মেরামতের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যেই আবার উজানের ঢল নামায় দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি পানির প্রবল চাপে টিকতে পারেনি। ফলে একই স্থানে ফের ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। এতে চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় কালিগঞ্জ এলাকার বাঁধের অংশটি ভেঙে যায়। ভাঙন দিয়ে দ্রুতগতিতে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নদীতীরবর্তী জনপদে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত জুলাইয়ের ভাঙনের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বাঁধ মেরামত সম্পন্ন হওয়ার আগেই নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, ৯ জুলাইয়ের ভাঙনের পর দ্রুত এবং টেকসইভাবে বাঁধ মেরামত করা করায় এ দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। কেন বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি সুরক্ষিত করা সম্ভব হয়নি এ প্রশ্ন স্থানীয়দের। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভাঙন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে এবং নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গত ৯ জুলাইয়ের ভাঙনের পর সরকার বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ৮৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। গতকাল বাঁধ ভাঙার ১ ঘন্টা আগে রোববার সকালে হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছ ঘটনাস্থলে গিয়ে মেরামতকাজ পরিদর্শন করেন। এ সময় জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ, পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ, হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি হুশিয়ার করেন আবারও বাঁধ ভাঙলে বড় ধরণের ক্ষতি হবে।
অন্যদিকে জুলাইয়ের বন্যার সময় স্থানীয়দের একটি বড় অভিযোগ ছিল, খোয়াই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ও প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এদিকে নতুন করে পানি ঢুকে পড়ায় কালিগঞ্জ ও আশপাশের গ্রামের মানুষ আবারও নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন। অনেক এলাকায় বাড়িঘরের উঠান ও আশপাশের রাস্তায় পানি উঠেছে। কৃষিজমি ও মাছের ঘের ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা। হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন নিচু অংশে পানি ওঠায় সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। পানি আরও বাড়লে যান চলাচল পুরোপুরি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ১শ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি সরে গেলে বাঁধটি সংস্কার করা হবে।
