প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই শপথের মধ্যদিয়ে শিক্ষকতা ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হলেন তিনি। শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাকে শপথ পাঠ করান ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সহস্রাধিক অতিথি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই শপথের মধ্যদিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে। অনুষ্ঠানের মঞ্চে ছিল তিনটি চেয়ার। মাঝের চেয়ারে বসেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তার ডান পাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাঁ-পাশে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। শপথ গ্রহণ শেষে নতুন প্রেসিডেন্ট ও বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিজেদের আসন পরিবর্তন করে বসেন। শপথ অনুষ্ঠানে দরবার হলের প্রথম সারিতে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী সৈয়দা শামিলা রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
প্রথম সারিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান আসন নেন।
দ্বিতীয় সারিতে ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান বাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খান ও নৌবাহিনীর প্রধান খোন্দকার মিজবাহ-উল আজীম। এই সারিতে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ প্রমুখ। শপথ অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে আসা মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন ফখরুল ইসলাম। ঢাকা কলেজ, দিনাজপুর কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জিতে হন চেয়ারম্যান। ছাত্রজীবনের বাম রাজনীতি থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুলের জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাপে, ভাসানীর হাত ধরে রাজনীতির আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করেছেন। সেখান থেকেই বিএনপিতে যোগদান, যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব ছিলেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি’র সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন তিনি। ২০১১ সাল থেকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। বিএনপি’র শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে আসার আগে তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপি’র মনোনয়নে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম। ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বিএনপি সরকারে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ায় তাকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০১৮ সালে একাদশ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে তিনি শপথ না নেয়ায় ওই আসনে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি’র জিএম সিরাজ সংসদে যান।
দুই মেয়ে নিয়েই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রাহাত আরা বেগমের সংসার। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী-সন্তান নিয়ে আছেন। সিডনির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ নিয়ে এখন ক্যানবেরার ফেডারেল মেডিকেল কাউন্সিলের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ধানমণ্ডির সানি ডেল স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। ওদিকে গত বৃহস্পতিবার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে বিদায় জানিয়েছেন বঙ্গভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে সেনাবাহিনীর প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) একটি সুসজ্জিত চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এর আগে তিনি বঙ্গভবনের দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এরপর বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর গত ২৪শে জুলাই হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশন কক্ষে বেলা দুইটা থেকে তিন ঘণ্টার ভোটগ্রহণ শেষে বিকালে গণনার পর ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। নির্বাচনের পর রাতেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোট ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে ৮ই অক্টোবর সংসদ সভাকক্ষে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয়েছিল।
রোববার উঠছেন বঙ্গভবনে: নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রোববার বঙ্গভবনে উঠবেন। সেদিন সকালে তিনি মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন থেকে বঙ্গভবনে যাবেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, রোববার বঙ্গভবনে ২ নম্বর গেটে পৌঁছানোর পর প্রেসিডেন্টকে নিয়ে পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল ‘গার্ড অব অনার’ মঞ্চে নিয়ে যাবে। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেবে। এ পর্ব শেষে প্রেসিডেন্ট বঙ্গভবনে তার কার্যালয়ে যাবেন। বঙ্গভবন সূত্র জানায়, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন প্রেসিডেন্ট। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার পর তাকে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেয়া হবে। শ্রদ্ধা জানানোর পর তিনি মিন্টো রোডের বাসায় ফিরবেন। এরপর গুলশানের বাসভবনে যেতে পারেন।
