গলায় ফাঁসে ১০০ মৃত্যু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়

গলায় ফাঁসে ১০০ মৃত্যু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়

ফন্ট সাইজ:

শুধু গলায় ফাঁস দিয়ে গত ৬ মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মারা গেছে ১০০ জন। এ ছাড়া আরও নানা উপায়ে আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে। আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এনিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভার তথ্যানুসারে এ বছরের জানুয়ারি মাসে গলায় ফাঁসে মারা যায় ১৩ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ জন, মার্চ মাসে ১৯ জন, সবচেয়ে বেশি এপ্রিল মাসে ২১ জন, মে মাসে ১৫ জন এবং জুন মাসে মারা গেছেন ২০ জন। এই ৬ মাসে অপমৃত্যুর হিসেবে নাম রয়েছে আরও ৮৫ জনের। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে অপমৃত্যু হয় ৬ জনের, ফেব্রুয়ারিতে ৬ জন, মার্চে ১৯ জন, এপ্রিলে ১১ জন, মে মাসে ২০ জন এবং জুন মাসে ২৩ জনের অপমৃত্যু হয়। গলায় ফাঁস ছাড়াও নানা উপায়ে প্রায় প্রতিদিনই জেলার কোথাও না কোথাও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। জুলাই মাসে আত্মহত্যা করেছে ২৩ জন। চলতি মাসের এই ক’দিনেও বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

‘এই দুনিয়া ছেরে গেলাম, আপন কেও হলনা, বড় ছেলে কে ডাকিলাম তোর মাকে দেহেযা, সে আসিলনা, মাসুমার জ্বালা আর পারিলামনা’। এমন চিঠি লিখেই বিষ খেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার জসিম উদ্দিন (৭০) নামে এক বৃদ্ধ। গত ১৬ই আগস্ট ভোররাতে উপজেলার তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের অষ্টগ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জসিম উদ্দিন অষ্টগ্রামের বলা গাজী বাড়ির মৃত ইদ্রিস মিয়ার ছেলে। তিনি অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, ওইদিন ভোররাত ৪টার দিকে পুত্রবধূ মাছুমার সঙ্গে পূর্ববিরোধের জেরে অভিমান করে গ্রামের একটি মসজিদের বারান্দার সামনে কীটনাশক জাতীয় বিষ পান করেন তিনি। বিষপানের পর মসজিদের বারান্দায় শুয়ে থাকেন। পরে মসজিদের লোকজন বিষয়টি তার পরিবারের সদস্যদের জানালে তাকে দ্রুত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন দুপুরে তার মৃত্যু হয়। নিহতের ছেলে হাসান মিয়া জানান, তার বাবা খুবই সহজ-সরল ছিলেন। তার স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান এবং স্ত্রীর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ সহ্য করতে না পেরেই আত্মহত্যা করেছেন। তার অভিযোগ, তার স্ত্রী কখনো তার বাবাকে যথাযথ সম্মান করতেন না।

বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার স্ত্রী বাড়ি থেকে চলে গেছেন। নবীনগরে স্বামীর সঙ্গে অভিমান করে মারুফা বেগম (২৭) নামে এক গৃহবধূ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। প্রায় পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৪ই আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। মারুফা বেগম নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকুট ইউনিয়নের মেরকুটা গ্রামের পূর্বপাড়ার কালু মিয়ার মেয়ে। তার স্বামী আমিরুল ইসলাম একই ইউনিয়নের বিদ্যাকুট গ্রামের মধ্যপাড়ার সত্তর মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় অটোরিকশাচালক। গত ৯ই আগস্ট রাত ১০টার দিকে স্বামীর বাড়িতে পারিবারিক কলহে ঘরের ভেতরে তীরের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেন মারুফা। নিহতের বাবা কালু মিয়া জানান, প্রায় সাত বছর আগে পারিবারিকভাবে মারুফার সঙ্গে আমিরুল ইসলামের বিয়ে হয়। তাদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। স্বামীর সঙ্গে অভিমান করেই তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। নাসিরনগরে দীর্ঘদিন ক্যান্সার ও জন্ডিস রোগে ভুগতে থেকে অসহ্য হয়ে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন নোয়াব মোল্লা (৯০)।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ৮ই আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে নোয়াব মোল্লা কীটনাশক পান করেন। এরপর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ই আগস্ট মারা যান তিনি। নিহতের মেয়ে শামসুন্নাহার জানান, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার ও জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাকে বাঁচানোর জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এমন নানা কারণেই জেলায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। ক্রমেই বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। গত আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আত্মহত্যার সংখ্যা উপস্থাপিত হলে এনিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভার সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানতে চান আত্মহত্যা এত বেশি কেন? কি কারণে এত আত্মহত্যা? এ ব্যাপারে সমাজসেবা বিভাগ কোনো কাজ করছে কিনা তাও জানতে চান। উত্তরে সমাজসেবা কর্মকর্তা জানান, এ ব্যাপারে তাদের কোনো প্রোগ্রাম নেই।