নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ইসলামী যুব আন্দোলন নেতা ও ইজিবাইক গ্যারেজ ব্যবসায়ী জাহিদ আল আমিন বুলবুল (৪০) হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বন্দর। পূর্ব বিরোধের জেরে তাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সন্ত্রাসী শেখ সিফাত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ, থানা ঘেরাও ও বিক্ষোভ করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মী এবং স্থানীয়রা। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর রাতেই অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত শেখ সিফাতসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ও একটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী।
যেভাবে হত্যা করা হয় বুলবুলকে: বৃহস্পতিবার রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন বুলবুল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় তার পথরোধ করে শেখ সিফাতসহ ১০-১৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি। এ সময় ধারালো অস্ত্র, লোহার পাইপ, রামদা, চাপাতি ও চাকু দিয়ে বুলবুলের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় বন্দর থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।
বিরোধের সূত্রপাত যেভাবে: পুলিশ সুপারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত বুলবুল পেশায় ইজিবাইক গ্যারেজ ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের বন্দর থানা পশ্চিম শাখার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন বলে সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন। পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহ করতেন বুলবুল। বিষয়টি নিয়ে শেখ সিফাত ও তার সহযোগীদের সঙ্গে তার বিরোধের সূত্রপাত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৩শে জুলাই রাতে শেখ সিফাতের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি বুলবুলের অটোরিকশা গ্যারেজে হামলা চালিয়ে প্রায় ১৮ লাখ ১৭ হাজার টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই ঘটনায় বুলবুল বাদী হয়ে বন্দর থানায় মামলা করেন।
এরপর থেকেই তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছিল বলে পুলিশের ভাষ্য। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় বুলবুলের সঙ্গে শেখ সিফাত ও তার সহযোগীদের বিরোধ আরও তীব্র হয়। এর জেরেই পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই অভিযান চালায় পুলিশ। বন্দরের পাক পাঞ্জাতন সিটি জামে মসজিদ এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত শেখ সিফাতসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-শেখ সিফাত, জুম্মন ওরফে হোয়াইট জুম্মান, মাহবুব হোসেন ওরফে মাহফুজ, রিয়াদ, মো. সিয়াম, মোসা. মিনারা, নাসিমা, রুমা, ইফরান, ইয়াসমিন ও সিজান ওরফে জিসান। পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, প্রধান আসামি শেখ সিফাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জুম্মনের বিরুদ্ধে ৯টি এবং রিয়াদের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ও একটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে।
বুলবুল হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার সকালেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বন্দরের মদনপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে অবরোধ শুরুর কথা বলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সড়কে অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি কোথাও টায়ার ও বাঁশ-কাঠে আগুন দেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অবরোধের কারণে চিটাগাং রোড থেকে সোনারগাঁ পর্যন্ত মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। বিচারের আশ্বাসের পর তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন।
এদিকে মহাসড়ক অবরোধের পাশাপাশি বুলবুল হত্যার প্রতিবাদে বন্দর থানায় ঘেরাও ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেন ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, বুলবুলকে দীর্ঘদিন ধরে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। পূর্বের মামলার কারণে তার ওপর হামলার আশঙ্কা থাকলেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে শুক্রবার বাদ জুমা বন্দরের শাহী মসজিদ এলাকায় বুলবুল হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল-পূর্ব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, বুলবুলকে শেখ সিফাত ও তার সহযোগীরা নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। তিনি অবিলম্বে শেখ সিফাতসহ জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। এ ছাড়া বুলবুল হত্যার বিচার ও হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ মহানগরের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আজ শনিবার নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সব থানায় বিক্ষোভ মিছিল, আগামীকাল রোববার সকাল ১১টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) বরাবর স্মারকলিপি প্রদান। নেতারা জানান, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এরই মধ্যে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও অন্যান্য আলামত। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা অস্ত্র, ওয়াকিটকি ও অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা এবং এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
