কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে ফের জমজমাট হয়ে উঠেছে ইয়াবা কারবার। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন পথে আসা ইয়াবার চালান ক্যাম্পকে ‘টার্নিং পয়েন্ট’Ñ হিসেবে ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালী বাজারকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং ক্যাম্পসংলগ্ন বহিরাগত বস্তিগুলোতে শত শত মানুষ ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে নারীদের একটি অংশ সরাসরি ইয়াবা বহন ও বিক্রিতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হলে তাদের নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি জটিল হতে পারে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো এলাকা ও সিন্ডিকেটভিত্তিক তথ্য তুলে ধরেছে। অভিযোগ রয়েছে, কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালী বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্যাম্পের ভেতরে ইয়াবা সরবরাহ ও লেনদেন চলে। পরে এসব চালান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করা হয়। শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, স্থানীয় তরুণদের একটি অংশও ধীরে ধীরে এই অবৈধ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইয়াবা কারবারের অর্থ আড়াল করতে একটি অংশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন বৈধ ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন।
শোরুম, টেলিকম ব্যবসা, রড-সিমেন্টের দোকান, এজেন্ট ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে নিজেদের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করছেন তারা। আবার কেউ কেউ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নামকাওয়াস্তে ঠিকাদারি বা বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অবৈধ অর্থকে বৈধ পথে দেখানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশের পর ক্যাম্পকে ব্যবহার করে চালান ভাগ করে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে ইয়াবা উদ্ধার হলেও মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে,এমন অভিযোগও রয়েছে। এদিকে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। বিশেষ করে এপিবিএন পুলিশ ও বালুখালী ক্যাম্প পুলিশের কিছু সদস্য নিয়মিত অর্থ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, মাঝেমধ্যে কারও সঙ্গে অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তাকে ইয়াবাসহ আটক করার ঘটনা ঘটে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্প ও ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার স্থানীয়দের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।
ইয়াবা কারবার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবারের মূলহোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান কঠোর। ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তের ওপার থেকে ইয়াবা আসা বন্ধ না হওয়া এবং ক্যাম্পকে পাচারের মধ্যবর্তী নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে উখিয়া-টেকনাফে মাদকের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় তরুণদের একটি অংশের দ্রুত অর্থবিত্তশালী হয়ে ওঠা এবং বৈধ ব্যবসার আড়ালে অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা জরুরি।
