২২ বছর সাড়ে ৯ মাস ধরে শুধু চিঁড়া আর মুড়ি খেয়ে বেঁচে আছেন পল্লী ডাক্তার আবদুল কাইয়ূম (৭০)। যৌবনে খাইতাম ডাল আর ভাত। ২২ বছর সাড়ে ৯ বছর খাই শুধু চিঁড়া আর মুড়ি। বয়স আমার প্রায় সাড়ে ৩ কুড়ি। বাড়িত নাই নারী। কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার গোপালনগর গ্রামের মৃত আবদুল কুদ্দুস মাস্টারের দ্বিতীয় ছেলে আবদুল কাইয়ূম। পৃথিবীতে কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ থাকে তার মাঝে তিনিও একজন। গোপালনগর বাজারে তার একটি আয়ুর্বেদীয় ওষুধের দোকান আছে। ওষুধ বেচাকেনা করে যা লাভ হয় তা দিয়ে চিঁড়া আর মুড়ি কিনে খান, এখানেই তিনি বিছানা পেতে ঘুমান। ২২ বছর সাড়ে ৯ মাস ধরে এভাবেই জীবনযাপন করছেন তিনি। কেন তিনি ভাত খাওয়া বন্ধ করে দিলেন তা জানতে গত শনিবার দুপুরে গিয়ে ছিলাম মানবজমিনের আমরা দুই প্রতিবেদক।
কেন এমন জীবন বেছে নিলেন তিনি। সরল সোজা ভাষায় তিনি বললেন, আমরা ১২ জন ভাই-বোনের মধ্যে ৮ ভাই ৪ বোন। এক ভাই মারা গেছেন। তিনি কবিতার ছন্দে অনেক কথা বলেন, কষ্ট তো আছেই কিন্তু কাউকে দোষারোপ করি না। ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭৬ সালে এসএসসি অকৃতকার্য হওয়ার পর। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। বাবা তখন বেঁচে আছেন। অভিভাবকরা বললো বিয়ে করতে, আমি তখন রাজি হইনি। কিন্তু আমি যখন রাজি হলাম তখন পরিবারের কেউ বিয়ের উদ্যোগ নেয়নি। আমি শর্ত দিয়ে ছিলাম মেয়ে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা হতে হবে। কে বা কারা এক সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, তা আমি জানি না। কেন বিয়ে হয়নি তাও জানি না।
এভাবেই কষ্ট বাড়তে থাকলো। স্থানীয়রা বলেছেন, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকাকে বিয়ে করতে না পেরে আর বিয়ে করেননি। একসময় ভাই-বউদের কাছে ভাত চেয়ে খাওয়াটা বিরক্ত বোধ করার কারণেও ভাত খাওয়া ছেড়েছেন। তবে তিনি কাউকে দোষারোপ করতে নারাজ। ডা. কাইয়ূম বলেন, সবমিলিয়ে এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা বিয়ে করতে না পারলে ভাত খাবো না। সেই থেকে ২২ বছর সাড়ে ৯ মাস চলছে ভাত না খেয়ে। মাঝে মাঝে না খেয়েও থাকি। তিনি বলেন, এখনো বিয়ে করতে ইচ্ছা আছে, তবে বিধবা বয়স্ক শিক্ষিকা হতে হবে। স্বেচ্ছায় যদি কোনো শিক্ষিকা বিয়ে করে তবে বিয়ে করবো। বিধবা হলেও কোনো সমস্যা নেই। মোবাইল ব্যবহার করেন না।
নামাজ পড়েন পাঁচ ওয়াক্ত। যখন মন ভালো থাকে না তখন না খেয়ে থাকেন। ৩৬ বছর ধরে দোকানে বিছানা পেতে দোকানেই ঘুমান। দোকানের জায়গাটা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। প্রতিবেশী মাহমুদ আলী (৫৫) জানান, তার লোভ-লালসা নাই। ২৩ বছর চিঁড়া-মুড়ি খেয়ে থাকেন। অত্যন্ত সরল মন। স্থানীয় দোকানদার মো. কামরুজ্জামান (৪৭) জানান, যখন তিনি বিয়ে করতে চেয়েছেন তখন পরিবার তাকে বিয়ে করাননি। পরিবারকে যখন কাইয়ূম বিয়ে করানোর অনুমতি দিলো তখন সে শর্ত দিলো শিক্ষিকা ছাড়া বিয়ে করবেন না। একপর্যায়ে শিক্ষিকা বিয়ে করতে না পেরে ভাত খাওয়া ছেড়ে দেন। কেউ খাওয়াতে চাইলেও খান না। কাইয়ূমের ছোট ভাই ফারুক পুলিশ (অবসরপ্রাপ্ত) আকুয়া বাইপাস মোড়ে কমিউনিটি সেন্টারে চাকরি করেন। তবে তার সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
