কর্মব্যস্ত রাজধানীতে নিরাপত্তা ও ভোগান্তি কমাতে নারী যাত্রীদের জন্য গোলাপি রংয়ের বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন-বিআরটিসি। তবে চাহিদার তুলনায় সংখ্যায় কম, স্টপেজ না জানা ও প্রচারণার অভাবে এখনো তেমন কোনো সাড়া জাগাতে পারেনি যাত্রীদের মাঝে। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও দেখা মিলছে না গোলাপি বাসের। আবার তীব্র যানজটের মধ্যে দোতলা বাসের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক চালকও।
বিআরটিসি বলছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা সংযুক্ত করে এসব বাসের রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ঢাকার ১০টি রুটে চলাচল শুরু করেছে। একটি একতলা ও ৯টি দোতলা বাস। নির্ধারণ করা হয়েছে মোট ১১৪টি স্টপেজ। এসব বাসের চালক ও কন্ডাক্টর সবাই নারী। আর কাউন্টারে দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি কমাতে বিআরটিসি ও সহজ ডটকমের যৌথ উদ্যোগে এই বাসগুলোর জন্য ই-টিকিটের ব্যবস্থা করেছে বিআরটিসি। যেকোনো স্থান থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে আগেই টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন যাত্রীরা।
গতকাল সরজমিন মোহাম্মদপুর টু মতিঝিল রুটে চলা গোলাপি বাসের মোহাম্মদপুর, শংকর, ধানমণ্ডি-১৫, সিটি কলেজ, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ, পল্টনসহ একাধিক স্পটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাসের দেখা পাওয়া যায়নি। ধানমণ্ডির সিটি কলেজ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শারমিন আক্তার বলেন, আমরা যারা প্রতিনিয়ত গণপরিবহনে চলাচল করি সেসব নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস নিঃসন্দেহে একটা ভালো উদ্যোগ। তবে বাসের দেখা পেলাম না। কখন, কোন জায়গা থেকে ছাড়ছে এই বাস, এমনকি তেমন কোনো আলাদা টিকিট কাউন্টারও তো দেখছি না।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসের জন্য অপেক্ষা করা নাসরিন বলেন, আমি পল্টনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই আমাকে মোহাম্মদপুর থেকে পল্টনে যাতায়াত করতে হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে দেখছি আমাদের নারীদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে খুব আনন্দও পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম প্রথম দিন থেকেই ওই বাসে যাতায়াত করবো। আর কোনো ঝক্কি পোহাতে হবে না। কিন্তু গত দুইদিনেও ওই গোলাপি বাসের দেখা পাইনি। আমাদের আসার আগেই নাকি চলে গেছে। শুনছি একটা মাত্র বাস দিয়েছে এই রুটে। এই একটা-দুইটা বাস দিয়ে তেমন কোনো কাজে আসবে না। নতুন বাজার যাত্রী ছাউনির সামনে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, কোথায় গোলাপি বাস। দুই ঘণ্টা হয়ে গেল এখানে দাঁড়িয়ে আছি, কই কোনো গোলাপি বাসের দেখা তো পেলাম না। তিনি বলেন, আমার বাসা ভাটারায়।
চাকরির সুবাদে প্রতিদিন এখান থেকে বিজয়নগর মোড়ে যাতায়াত করি। আজকেও সেখানে যাচ্ছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত নারীদের জন্য আলাদা কোনো বাসের দেখা পাইনি। কোথা থেকে আসবে, কোথায় কোথায় যাবে, টিকিট কোথা থেকে পাওয়া যাবে, কয়টায় কয়টায় বাস আসবে- এসব কিছুই আমরা জানি না। নতুন বাজার ?পুলিশ বক্স এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মৌমিতা রায় বলেন, মহিলা সার্ভিসের গোলাপি রংয়ের একটা বাস সকালে দেখেছি যেতে। কিন্তু যে যানজট রাস্তায় তাতে এই একটা বাস দিয়ে একাধিক ট্রিপ দেয়া সম্ভব নয়। ভালো করে প্রচার-প্রচারণা ও বাসের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করলে এই বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। খিলগাঁও তালতলা, রেলগেট, বাসাবো, বৌদ্ধ মন্দির, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, আরামবাগ হয়ে মতিঝিল রুটে একই অবস্থা দেখা যায়।
এদিকে মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান, মতিঝিল রুটে চলা মহিলা সার্ভিসের একটি মাত্র গোলাপি বাস সকাল ৯টার দিকে দেখা গেলেও তাতে যাত্রী ছিল হাতে গোনা। শিশু মেলা এলাকা দিয়ে যাওয়া বাসটির দ্বিতীয়তলা ছিল খালি। নিচতলার সামনের দিকে কিছু যাত্রী থাকলেও বেশির ভাগ আসনই ছিল ফাঁকা। চালকের আসনের পাশে বসে ছিলেন একজন পুরুষ সহকারী।
মিরপুর টু মতিঝিল রুটের ওই গোলাপি বাস ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলা বেশির ভাগ মহিলা সার্ভিসের বাসেই নারী চালকের পাশে পুরুষ সহকারী দেখা গেছে। অনেক স্থানে ফ্লাইওভারে ওঠার আগে নারী চালকের পরিবর্তে পুরুষ চালককে বাস চালাতেও দেখা গেছে।
এসব বিষয়ে মহিলা সার্ভিসের গোলাপি বাসের এক নারী চালক বলেন, একজন নারীকে দিয়ে এত বড় এই দোতলা বাস চালানো সম্ভব না। আমি অন্তত পারছি না। আমার শরীরটার সঙ্গে এই বাসটা যায় না। তিনি বলেন, নারী পাইলট, নারী মেট্রোরেল চালক আছে কিন্তু সেসবের সঙ্গে এই বাস এক নয়। তিনি বলেন, নারী চালক হিসেবে আমরা খুশি না। কিন্তু ঢাকার সড়কে বিশৃঙ্খল অবস্থা। অন্য বাস চাপ দেয়। এই সবকিছু মিলে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই আমাদের পাশে একজন করে পুরুষ সহযোগী দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন-বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা বলেন, এত দ্রুত ভালো-মন্দ নির্ধারণ করা সমীচীন নয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণের পরে সমস্যাগুলো ও সুবিধাগুলো চিহ্নিত করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়গুলো জানানো হবে। তখন চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানও থাকবে। বর্তমানে সার্ভিস সংশ্লিষ্ট সবাই সবকিছু পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। তিনি বলেন, সেবাচালু হওয়ার পর থেকেই সড়কে নামানো বাসগুলোকে পুরাতন উল্লেখ করে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছে। সেই সঙ্গে স্টাফদের নিয়ে নানা ট্রল ও নেতিবাচক প্রচার তাদের মনোবল অনেকটা ক্ষুণ্ন করেছে। এতে চালক ও সহকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
