কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলতে বলতে হারিয়ে যাওয়া ছেলে মোহাম্মদ ফরিদকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ মা নূরজাহান বেগম। ২৫ বছর আগে যে ছেলেকে হারিয়ে পরিবারের সবাই একসময় ধরে নিয়েছিলেন, ফরিদ আর বেঁচে নেই, সেই সন্তানই শুক্রবার সকালে ফিরে এলেন উখিয়ার মরিচ্যাপালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ার নিজ বাড়িতে। দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মায়ের বুকে ফিরলেন ফরিদ। ছেলেকে ফিরে পেয়ে মায়ের কান্না আর ফরিদের আবেগঘন মুহূর্তে সেখানে তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ।
মা-ছেলের কান্না দেখে আশপাশের লোকজনের চোখেও পানি চলে আসে। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। এরপর জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় ২৫ বছর পর তুরস্ক থেকে দেশে ফেরার পর নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং শুধু ‘উখিয়া, কক্সবাজার’, এই তথ্যটুকুই বলতে পারছিলেন তিনি। গত ১৮ই আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি তাকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে।
এরপর ফরিদের পরিবারের সন্ধানে নামে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যাপালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় তার পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। গত ১৯শে আগস্ট বিকালে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কথোপকথনের একপর্যায়ে ফরিদের হাতে ছয়টি আঙ্গুল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সৈয়দ আলম। ছোটবেলার এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যই ফরিদের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে বাবার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান ফরিদ। পরে তারা পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে জীবিকার সন্ধানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি।
পরে চিকিৎসকদের তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সুযোগ নিয়ে এক মানবপাচারকারী তাকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। এরপর পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছান ফরিদ। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান তিনি। অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে সেখানে বসবাসের সময় তুরস্কের পুলিশ তাকে আটক করে। পরে সর্বশেষ আটকের পর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। গত বৃহস্পতিবার (২০শে আগস্ট) ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ফরিদকে তার ছোট ভাই ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ব্র্যাকের সহায়তায় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে উখিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন সৈয়দ আলম। শুক্রবার সকালে তারা নাছির পাড়ার বাড়িতে পৌঁছান।
ভাইকে ফিরে পেয়ে সৈয়দ আলম বলেন, আমরা ধরে নিয়েছিলাম ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমাদের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সরকারের যুগ্ম সচিব এটিএম মাহবুবুল করিম, ব্র্যাক’র সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফরম) শরিফুল ইসলাম হাসান, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা একেএম রাসেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ব্র্যাক’র সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফরম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দেয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু পরিবারের কাছে ফেরানো নয়, ফরিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও কিছু করার উদ্যোগ নেয়া হবে, যাতে তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। দীর্ঘ ২৫ বছরের অন্ধকার, বিচ্ছেদ আর অনিশ্চয়তার পর অবশেষে মায়ের বুকে ফিরেছেন উখিয়ার ফরিদ। যে মা একসময় ধরে নিয়েছিলেন তার বড় ছেলে আর বেঁচে নেই, সেই মায়ের সামনে আজ ফিরে এসেছে হারিয়ে যাওয়া সন্তান। ‘ও বাপ’ বলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে মায়ের কান্না আর ফরিদের চোখের পানি যেন বলে দিচ্ছিল, ২৫ বছরের অপেক্ষার চেয়ে বড় কোনো দূরত্ব নেই, আর আপন ঘরে ফেরার চেয়ে বড় কোনো আনন্দও নেই।
