ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে ট্রাইব্যুনাল

এটা সর্বোচ্চ আদালত, আপনি সাবধানে কথা বলবেন

ফন্ট সাইজ:

সেনা কর্মকর্তাদের পোস্টিং নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান গোলাম মর্তূজা মজুমদার সাবেক সেনা প্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে সতর্ক করে বলেন, এটা সর্বোচ্চ আদালত। আপনি সাবধানে কথা বলবেন। কারণ আপনারও ক্ষতি হতে পারে, এমনকি মামলাও হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম-খুনের অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৃতীয় দিনের মতো ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে জেরা করা হয়। এদিন আসামি জিয়াউলের পক্ষে আইনজীবী আমিনুল গনি তাকে এ জেরা করেন। জিয়াউলের বিরুদ্ধে করা এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া গত ৮ ও ৯ই ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি দেন। তাকে তিন দফায় জেরা করলেও আসামিপক্ষের জেরা সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তী জেরার জন্য আগামী ৩রা মার্চ দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দিন ধার্য করেন।
এদিন জেরার একপর্যায়ে ইকবাল করিম বলেন, সেনাপ্রধান থাকাকালে কতোজন গুম হয়েছিল, তা আমি বলতে পারবো না। যারা গুম হয়েছিল, তাদের কাউকে আমি উদ্ধারের চেষ্টা করি নাই। কারণ এটা আমার দায়িত্বাধীন ছিল না এবং আমি জানতাম না, কে কখন কোথায় গুম হয়েছে। এমনকি কে বা কারা গুম হ”েছ, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর (এমআই) কোনো তথ্য দিতে পারে নাই। তবে গুম হ”েছ মর্মে তারা আমাকে জানিয়েছে। গুমের সংস্কৃতি প্রতিরোধ করতে অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল জানিয়ে ইকবাল করিম বলেন, এই মর্মে কোনো দালিলিক প্রমাণপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করি নাই এবং গুম প্রতিরোধের জন্য সুপার চিফ বা প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি পাঠাই নাই কিংবা লিখিতভাবে জানাই নাই।
একপর্যায়ে ইকবাল করিমকে জিয়াউল আহসানের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো সেনাবাহিনীর আবাসন প্রকল্প ‘জলসিঁড়ি’ নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করেন। জবাবে তিনি বলেন, ওই প্রকল্পের তিনি প্রধান ছিলেন। রূপগঞ্জের ২৪টি মৌজায় জমি কেনা নিয়ে ¯’ানীয়দের সঙ্গে বিরোধে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় এবং এ ঘটনায় কোনো ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’ করা হয়নি। সেনাবাহিনী ক্যাম্পে আক্রমণ ও আগুন দেয়ার ঘটনায় আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছিল। ঘটনার সময় জেনারেল মুবিন সেনাপ্রধান ছিলেন এবং অপারেশন পরিদপ্তর এটি নিয়ন্ত্রণ করেছিল বলে জানান তিনি। পরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গেলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, আপনাকে এত ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আপনি উত্তরপাড়ার এক্সপার্ট আর আমরা দক্ষিণপাড়ার এক্সপার্ট।
যদি বেঁচে থাকি ১২টার মধ্যে বাড়ি আসবো, শহীদ হলে ছেলেমেয়েদের দেখে রেখো: ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৫ই আগস্ট সকালে আমার স্বামী বলেন, যদি আমি শহীদ হই আমার ছেলেমেয়েদের তুমি দেখে রেখো, আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকবা। এই বলে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যান। বাজারে ছেলের সঙ্গে দেখা হলে আমার স্বামী আমার ছেলেকে বলেন, যদি তিনি শহীদ হন, তবে আমার ছেলে যেন তাকে জানাজা দেয়। বেঁচে থাকলে ১২টার মধ্যে বাড়ি ফিরবেন। কিš‘ আর বাড়ি ফেরা হয়নি শহীদ আশরাফুল ইসলামের। এভাবেই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ আশরাফুলের স্ত্রী লাবনী আক্তার ইতি। কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতাদের গুলিতে নিহত স্বামী হত্যার বিচার চাইলেন তিনি। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে তিনি এ বিচার চান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে ৯ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন লাবনী আক্তার ইতি। এদিন ফাহিমা খাতুনসহ মোট দু’জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাদের জেরা করেন পলাতক আসামিদের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন।
জবানবন্দিতে ইতি বলেন, কুষ্টিয়া বেঙ্গল কোম্পানিতে চাকরি করতেন শহীদ আশরাফুল। তার ১২ বছর বয়সী এক ছেলে ও পাঁচ বছরের মেয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে মজমপুর বাসস্ট্যান্ডে একটি ছোট ছেলেকে গুলি করেছে পুলিশ। দৃশ্যটি দেখে বাসায় এসে একটি লাঠি নিয়ে বের হয়ে যান তিনি। ওই সময় আমি তাকে আটকানোর চেষ্টা করেও পারিনি। তিনি বলেন, আমি অবশ্যই যাবো। যদি আমি শহীদ হই, তাহলে আমার ছেলেমেয়েদের তুমি দেখে রেখো। পরদিন ৫ই আগস্ট সকালে বের হওয়ার সময় আমার স্বামী বলেন, যদি আমি শহীদ হই, তবে তুমি আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকবা। তখন তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও কথা শোনেননি। বেলা ১২টার পর ছেলে আমাকে বলে ১২টা বেজে গেছে তুমি বাবাকে ফোন দাও। আমি তখন ফোন খোঁজার সময় বুঝতে পারি আমার স্বামী আমার ফোন সঙ্গে নিয়ে গেছেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ির পাশের একজনের মোবাইল দিয়ে আমার স্বামীকে ফোন দেই। ফোনে তিনি জানান, কুষ্টিয়া মডেল থানার সামনে আছেন। সেখানে খুব গোলাগুলি হ”েছ। বাড়ি ফেরার মতো পরিবেশ নেই। তখন আমি পেছন দিক দিয়ে নদী পার হয়ে চলে আসতে বলি। আমার স্বামী জানায়, তার আর বাড়ি ফেরা হবে না। পরে আমি আবার আমার স্বামীকে ফোন দেয়ার চেষ্টা করি। কিš‘ তার মোবাইলে সংযোগ পাইনি। দুপুর দেড়টার সময় বাড়ির পাশের একটি ছেলে এসে জানায়, আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে বিকাল ৩টায় তিনি মারা যান।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন