গত ২৮শে এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। এ ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। থানা পুলিশের পর মামলাটির বর্তমানে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তবে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ৪০ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
ওইদিন রাত ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের বটতলা এলাকায় শহীদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনের সড়কে হেঁটে যাওয়ার সময় টিটনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী। হাতে, পিঠেসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন টিটন। পরে আশপাশের লোকজন রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। পরে পিবিআই সদস্যরা নিশ্চিত করেন- গুলিতে নিহত ব্যক্তি ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। তার বাবার নাম কে এম ফকরুদ্দিন ও মায়ের নাম আকলিমা বেগম। ঠিকানা- হাজারীবাগ থানার জিগাতলার সুলতানগঞ্জ রোড।
প্রত্যক্ষদর্শী, পরিবারের স্বজন ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, টিটন হত্যাকাণ্ডটি কোনো আকস্মিক হামলা ছিল না। পরিকল্পিতভাবেই টিটনকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মূলত কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়ার পর টিটন কোনো কাজ করতেন না। কোরবানি ঈদকে ঘিরে বসা বসিলা পশুর হাটের ইজারা নেয়ার জন্য শিডিউল কিনেছিলেন টিটন। যা তিনি তার বড় ভাইকেও বলেছিলেন। তবে আগে থেকেই ওই এলাকার একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হেলাল ও তার সহযোগীরা। তারাও ওই হাটের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল। আর এই নিয়েই হেলালের সহযোগী হিসেবে পরিচিত কাইলা বাদল, শাহজাহান, রনির সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয় টিটনের। পরিবারের অভিযোগ- ওই দ্বন্দ্ব মীমাংসার কথা বলেই পিচ্চি হেলাল নিজে তার ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে টিটনকে ডেকে আনে নিউমার্কেটের বটতলায়। আর টিটন সেখানে আসার আগে থেকেই মোটরসাইকেল নিয়ে মুখে মাস্ক ও মাথায় টুপি পরে তাকে হত্যার জন্য সেখানে ওত পেতে ছিল শুটাররা। সরাসরি মোট চারজন এই কিলিং মিশনে অংশ নেয়। দু’জন গুলি চালালেও বাকি দু’জন অস্ত্র ও মোটরসাইকেল নিয়ে তাদের নিরাপত্তায় ছিল। আর এই কিলিং মিশনের সমন্বয় করে বাদল ওরফে কাইলা বাদল। বাদল ছাড়াও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় ভাঙাড়ি রনি, শাহজাহানসহ আরও বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। সূত্র বলছে- বাদল ও রনি গুলি করার পর তাদেরকে মানুষ ধাওয়া দিলে বিডিআর ৩ নম্বর গেটের কাছে নিজের মোটরসাইকেল দিয়ে তাদের বের হতে সাহায্য করে শাহজাহান। ওইসময় আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে বিডিআর গেটের পাশের গলি দিয়ে হাজারীবাগ হয়ে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের পাশ দিয়ে রায়ের বাজারের দিকে পালিয়ে যায় তারা।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর ২০২৫ সালের ১৩ই আগস্ট আদালতের জামিনের মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্তি পায় টিটন। এরপর বিভিন্ন সময়ে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে তার সঙ্গে আমার কথা হতো। দুবার সে আমাদের বাড়ি যশোরেও যায়। গত ঈদে আমার সঙ্গে তার দেখাও হয়। কিছুদিন আগে সে আমাকে জানায়, একটা শিডিউল কিনছি ইনশাআল্লাহ মোটামুটি কাজের মাধ্যমে থাকতে পারবো। গত ২৬শে এপ্রিল আমাকে আবারো ফোনে বলেন, আমার সঙ্গে ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, কাইলা বাদল, শাজাহান, ভাঙাড়ি রনিদের বসিলা গরুর হাটের ইজারার শিডিউল নিয়ে ঝামেলা চলছে। এরপর ২৭শে এপ্রিল আমাকে আবার বলে, তারা আমাকে ডেকেছে সমঝোতার মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার জন্য। আশা করি- সব ঠিক হয়ে যাবে। এরই মধ্যে আমার কাছে খবর আসে আমার ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত টিটনের বড় ভাই রিপন বলেন, আমার ভাইকে হেলাল ও তার লোকজনই হত্যা করেছে। ইমনের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। এমনিতে ছোটখাটো ঘটনা তো ভাইবোনের মধ্যে থাকতেই পারে। তবে তা কিলিং পর্যায়ের কোনো বিরোধ হতে পারে না। আমি তা মনে করি না। কারণ, ইমন আমার মায়েরও যত্ন করতো। আমি পুলিশকে সব জানিয়েছি। আমি চাচ্ছি ন্যায়বিচার হোক। সবার কাছে অনুরোধ, যেন ন্যায়বিচার পাই আমরা। বিষয়টি নিয়ে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, টিটন হত্যা মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অনেকের নামই আমাদের কাছে এসেছে। আমরা সব কিছু যাচাই-বাছাই করছি। মহানগর এই গোয়েন্দা প্রধান বলেন, খুনিরা এখন পুলিশের মোটামুটি একটি ছকের ভেতরে চলে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের অবস্থান এই মুহূর্তে ডিসক্লোজড করতে চাচ্ছি না। তবে, এতটুকুই বলবো পুলিশ অপরাধীদের খুব কাছাকাছি। খুনিরা যে গুলি করার পর মোটরসাইকেলে করে রায়ের বাজার পর্যন্ত গেছে সেটা আমরা নিশ্চিত হয়েছি। এরপরের পথটুকু শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। আমরা কোনো বিষয়ে ছাড় দিচ্ছি না। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যেই হত্যাকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবো।
