নিহতদের ৫ জন বাংলাদেশি, চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন

কলকাতায় হোটেলে আগুনে পুড়ে ৯ জনের মৃত্যু

ফন্ট সাইজ:

পশ্চিমবঙ্গের মধ্য কলকাতার এক আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ছয় জন পুরুষ, দু’জন নারী এবং একটি শিশু রয়েছে। ধোঁয়ার কারণে দমবন্ধ হয়ে এদের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় জানা গেছে। এরমধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি আর ২ জন ভারতীয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দু’জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এরা হলেন- কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন, তাদের সন্তান স্বর্ণশিষ দত্ত ও শ্বশুর মো. আকরাম আলী। দশদিন আগে চিকিৎসার জন্য শ্বশুরকে নিয়ে সপরিবারে ব্যাঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন। সেখানকার চিকিৎসার পর দেশে ফেরার পথে কলকাতায় বিরতি নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিরতিই অভিশাপ হয়েছে দেবাশীষের জীবনে। সাভারের একজনেরও মৃত্যু হয়েছে। তার নাম আহমেদ বাবু। কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসও এই পাঁচজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের উপহাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ বলেছেন, উপহাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা থানা ও মর্গে গিয়েছিলেন, তিনি সহ স্থানীয় পুলিশ এই পাঁচ বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করেছে।’ তবে, নিউমার্কেটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশি আছেন কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে।

দমকল মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি ও ভারতীয় উভয় নাগরিকই রয়েছেন। আরও একজন ভারতীয়র পরিচয় জানা গেছে। তিনি হোটেলের কর্মী ছিলেন। তার নাম সঞ্জীব পাসওয়ান। গিরিডির বাসিন্দা। পেটের তাগিদে ঝাড়খণ্ড থেকে এক বছর আগে কলকাতায় কাজে এসেছিলেন সন্দীপ পাসওয়ান। হাসপাতাল চত্বরে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন যুবকের কাকা ও দাদা। নিহত অপরজন শিলিগুঁড়ির বাসিন্দা ইয়োগ নারায়ণ আগরওয়াল।

দমকল বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, নিহতদের অধিকাংশ চিকিৎসার জন্য ভারতে এসেছিলেন। বুধবার দুপুরে এক্স হ্যান্ডেলে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লিখেছেন, কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির খবর শুনে অত্যন্ত মর্মাহত। এই দুর্ঘটনায় যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমার সমবেদনা রইলো। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে তিনি লিখলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করছে।’

কলকাতার নিউমার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন নামের ওই হোটেলে মঙ্গলবার গভীর রাত ২টা নাগাদ আগুন লাগে বলে প্রশাসন সুত্রে বলা হয়েছে। আবাসিকরা সকলে তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। দমকল ও জরুরি পরিষেবা কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানো এবং উদ্ধারের কাজ শুরু করেন। বলা হয়েছে, ধোঁয়ায় বেশ কয়েকজন জ্ঞান হারিয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘন ধোঁয়ার কারণে দমকলকর্মীদের সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলাগুলোতে পৌঁছাতে অসুবিধা হয়েছে।

আগুন লাগার কারণ স্পষ্ট নয়। অনুমান করা হচ্ছে এসি বিস্ফোরণ আগুনের কারণ হতে পারে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার পরই আগুনের কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। হোটেলটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত একটি পুরনো ভবনে ছিল। পাঁচতলার এই ভবনটিতে প্রতিটি তলায় তিন চারটি হোটেল বা গেষ্ট হাউস রয়েছে। দমকল সূত্রে বলা হয়েছে, আগুন লেগেছিল তিনতলার হোটেলে। তবে আগুনের তীব্রতা বেশি ছিল না। আগুনের কারণে ধোঁয়া বাড়তে থাকে। গোটা হোটেল ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। কোন পথ দিয়ে বের হবেন, তা বুঝেই উঠতে পারছিলেন না আবাসিকেরা।
আবাসিকদের অভিযোগ, ভবনটিতে কোনো অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। বাজেনি কোনো ফায়ার এলার্ম। নামা-ওঠার সিঁড়ি সংকীর্ণ। ছিল না আলাদা বহির্গমন পথ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবনটিতে বেআইনি ভাবে অনেক হোটেল তৈরি করা হয়েছে।

দমকল মন্ত্রী দাবি করেছেন, দমকলবাহিনীর তৎপরতায় ভবনটির বিভিন্ন হোটেল থেকে ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এই ভবনটির ভেতরের অবস্থা খুবই খারাপ। এর ভেতরে বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে। এখানে যা চলছিল তা দেখে আমি হতবাক। তিনি যোগ করেন, ভবন কর্তৃপক্ষ মৌলিক নিরাপত্তা ও নির্মাণ বিধি মেনে চলেনি। হোটেলটির পরিচালনায় একাধিক অনিয়ম ছিল।

এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ভবনটির মালিক বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা করা হয়েছে এবং পুলিশ মালিকের বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরু করেছে। ডিসিডিডি’র নেতৃত্বে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কী পরিস্থিতিতে আগুন লেগেছিল এবং নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা চলছে।

বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেছেন, নিয়মনীতির বালাই ছিল না। মানা হয়নি পুরসভা, দমকলের নির্দেশিকাও। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসির দিকে তিনি আঙুল তুলেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন, সিইএসসি কীভাবে অনুমতি দিলো? কেন বহুতলের ভিতরে বেনিয়ম সামনে আসেনি?
চলতি সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গে এটি দ্বিতীয় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। এর আগে সোমবার বীরভূমের মন্দির শহর তারাপীঠের একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনার পর অগ্নি-সুরক্ষা বিধি না মানার অভিযোগে তারাপীঠের অন্তত ১৫টি হোটেলের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রশাসন।

বাংলাদেশিদের মুখে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের বিবরণ
কলকাতার শিখা ইন হোটেলে আগুনে আটকে পড়া বাংলাদেশিরা শুনিয়েছেন তাদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। এই হোটেলের অধিকাংশ আবাসিকই বাংলাদেশি বলে জানিয়েছেন হোটেলেরই এক কর্মী। যেমন মুহাম্মদ আসাফুল জামাল, সোমাইয়া আখতার, রেজাউল ইসলাম, নাজমুল সরকাররা আগুনের ভয়ঙ্কর কথা শোনাচ্ছিলেন হোটেলের নিচে উপস্থিত সাংবাদিকদের। কেউ ঢাকার, কেউ গাজীপুরের, কেউ অন্য জায়গার। অনেকের চোখে-মুখে তখনো আতঙ্কের রেশ।

রেজাউল ইসলাম ও তার স্ত্রী সোমাইয়া আখতার বলেছেন, কীভাবে কার্নিশে নেমে মোবাইলের আলোর সংকেত দিয়ে তারা রক্ষা পেয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় ঘুরতে এসেছিলেন এই দম্পতি। দু’দিন আগে নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ওঠেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে হঠাৎ তাদের ঘরের দরজায় কেউ জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকেন। জানতে পারেন আগুন লেগেছে। প্রাণ বাঁচাতে জানালা বেয়ে নেমে পড়েন কার্নিশে। চিৎকার করতে থাকেন উদ্ধারের জন্য। অন্ধকারের মধ্যে নিচের মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মোবাইলের আলো জ্বেলে সংকেত দেয়ার চেষ্টা করেন। এইভাবে প্রায় আধঘণ্টা কার্নিশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মৃত্যুভয়কে সঙ্গী করে। পরে দমকলের কর্মীরা এসে মই দিয়ে নামিয়ে আনে দম্পতিকে।

ঢাকার আরেক বাসিন্দা মুহাম্মদ নাজমুল সরকার হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা করাতে কলকাতায় এসেছিলেন। ছিলেন চারতলার ওই হোটেলে। তিনি কাঁপতে কাঁপতে বলেন, একটা সময় মনে হয়েছিল মরেই যাবো। অক্সিজেনের অভাব ছিল। শ্বাস নিতে পারছিলাম না। নাজমুল বলেছেন, হোটেলের কর্মচারীরা বার বার বলছিলেন উপরে উঠুন। কিন্তু উপরে ওঠার রাস্তা এতটাই সরু যে, একজন করে উঠতে পারেন। লোহার সিঁড়ি। কোথা দিয়ে পালাবো, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। নিচে নামার কোনো পরিস্থিতি ছিল না। ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল চারদিক। এক হাত দূরে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া ঢুকে পড়ে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে কোনোরকমে উপরে উঠেছিলাম। পরে দমকলের কর্মীরা এসে উদ্ধার করেন।