শিল্প খাতে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে পাইপলাইনের বাইরে থাকা কারখানাগুলোর জন্য বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের পথ আবারও কিছুটা খুলেছে। প্রায় নয় মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে শিল্পে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) পরিবহন শুরু করেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন পিএলসি। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদনের পর কোম্পানিটির গ্যাস পরিবহনকারী টিউব ও ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলারগুলো আবার চলাচল শুরু করায় ঢাকা, গাজীপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পাইপলাইনের বাইরে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দেশে যখন গ্যাসের চাপ কমে অনেক শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ঠিক তখনই ইন্ট্রাকোর এই কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কোম্পানিটির নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী সরবরাহ এখনো চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে ইন্ট্রাকো পুরো সক্ষমতায় কাজ করলেও জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সংকট তাৎক্ষণিকভাবে কাটবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প খাতের সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পের দুই শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএও সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ক্যাসকেড সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহের অনুমতি চেয়েছে। ২৮ জুলাই দেয়া পৃথক চিঠিতে সংগঠন দুটি সংকট চলাকালে কারখানাগুলো সচল রাখতে সাময়িকভাবে সিএনজি সংগ্রহের অনুমতি চায়।
এদিকে শিল্পের গ্যাস সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্প উদ্যোক্তাদের সমস্যা শুনে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সংকট সমাধানে কার্যকর পথনকশা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন তিনি। সংকটের অগ্রগতি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
নয় মাস পর সচল বহর:
ইন্ট্রাকোর গ্যাস পরিবহন কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয় গত বছরের নভেম্বরে। তখন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে লাইসেন্স ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে কোম্পানিটির অধিকাংশ গ্যাসবাহী যান প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস এনে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহনগুলোর অনুমোদন আটকে ছিল। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে কয়েক দফায় অনুমোদন দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সম্প্রতি বিস্ফোরক অধিদপ্তর ইন্ট্রাকোর বাকি ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলারগুলোর সক্ষমতা যাচাই করে গ্যাস পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে। ফলে কোম্পানিটির পুরো বহর পুনরায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মহসিন উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্ট্রাকোর ব্যবহৃত যানবাহনগুলোর সক্ষমতা যাচাই করতে চীনের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগার পরিদর্শন করা হয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ইন্ট্রাকো ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত দল সরেজমিনে প্রস্তুতকারক ও সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিদর্শন করে।
প্রতিনিধি দলের যাচাইয়ে যানগুলো নিরাপদভাবে গ্যাস পরিবহনের উপযোগী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে বাকি ট্রেইলারগুলোর স্থায়ী লাইসেন্স দিতে বিদ্যমান বিধিমালায় পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোলার গ্যাস যাবে শিল্পে:
পাইপলাইনের বাইরে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি রয়েছে ইন্ট্রাকোর। ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে উদ্বৃত্ত গ্যাস সংগ্রহ করে তা সিএনজিতে রূপান্তর করে ট্রেইলারের মাধ্যমে ঢাকা, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের শিল্প এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী শুরুতে প্রতিদিন ৫ মিলিয়ন ঘনফুট (৫ এমএমসিএফডি) গ্যাস পরিবহনের কথা ছিল। পর্যায়ক্রমে এ পরিমাণ ২৫ এমএমসিএফডিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। তবে গ্যাস পরিবহন বন্ধ হওয়ার আগে ইন্ট্রাকো দৈনিক প্রায় ৩ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করছিল। চুক্তির আওতায় ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস ইন্ট্রাকো কিনে সিএনজিতে রূপান্তর করে। কোম্পানিটি প্রতি ইউনিট গ্যাস ১৭ টাকা ১০ পয়সা দরে কিনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা দরে বিক্রি করে। সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ ব্যতিক্রমী। প্রথমে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে উদ্বৃত্ত গ্যাস সংগ্রহ করে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। পরে ইন্ট্রাকো সেটি উচ্চচাপে সংকুচিত করে ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলারে ভরে। এরপর ট্রেইলার সড়কপথে শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে যায়। সেখানে রেগুলেটিং কন্ট্রোল ইউনিটের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার পিএসআই চাপের গ্যাস কমিয়ে শিল্পকারখানার বয়লার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্রে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
সংকটের মধ্যে চাহিদা বাড়ছে:
ইন্ট্রাকোর কার্যক্রম যখন নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রায় বন্ধ ছিল, তখনই শিল্পে গ্যাসের সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া ও রাজধানীর আশপাশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বহু কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
সাম্প্রতিক সংকটে বিকল্প হিসেবে অনেক কারখানা সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কিন্তু তিতাস গ্যাস সম্প্রতি অনুমোদিত যানবাহনে স্থাপিত নয়—এমন খোলা সিলিন্ডার বা ক্যাসকেডে গ্যাস বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেয়। নিরাপত্তা এবং গ্যাস আইন ও বিতরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপরই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ শিল্পকারখানার জন্য সাময়িকভাবে সিএনজি সংগ্রহের সুযোগ চায়। বিকেএমইএর ২৮ জুলাইয়ের সার্কুলারেও সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহ অব্যাহত রাখার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রপ্তানিমুখী শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন ও রপ্তানি দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিল্প মালিকদের ভাষ্য, পাইপলাইনের গ্যাসের পাশাপাশি নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে সিএনজি বা নন-পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো গেলে সংকটকালে অনেক কারখানা উৎপাদন ধরে রাখতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নতুন উদ্যোগ:
গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তৎপরতাও বেড়েছে। বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চান এবং সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর আগে ২২ জুলাই বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শিল্প খাতের গ্যাসসংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে। পরে সমস্যা সমাধানে উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে কমিটির বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আকস্মিকভাবে যোগ দিয়ে উদ্যোক্তাদের বক্তব্য শোনেন এবং দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, আগে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে শিল্পে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সরকার বিষয়টি সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। কোন কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, কোনটি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কোথায় কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—তা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইন্ট্রাকোর সামনে বড় সুযোগ, বড় চ্যালেঞ্জ:
শিল্পে গ্যাসের চাহিদা বাড়ার কারণে ইন্ট্রাকোর জন্য আবারও বড় বাজার তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা কিংবা পাইপলাইনে পর্যাপ্ত চাপ না পাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে নন-পাইপলাইন গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থায় চাপ পড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে গ্যাস পরিবহনে স্থবিরতার প্রভাব কোম্পানির আয়েও পড়ে। আর্থিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ইন্ট্রাকোর শেয়ারপ্রতি আয় কমে ১৩ পয়সায় দাঁড়ায়, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৭ পয়সা। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ১৯ পয়সা লোকসান করে, আগের বছরের একই সময়ে যেখানে ৩৫ পয়সা মুনাফা হয়েছিল।
এদিকে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ইন্ট্রাকোকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়। বাজার-তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত লভ্যাংশ নির্ধারিত সময়ে বিতরণ না করার কারণে এ পরিবর্তন করা হয়। ফলে গ্যাস পরিবহন পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া কোম্পানিটির জন্য শুধু ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সুযোগ নয়, আর্থিক ঘুরে দাঁড়ানোরও বড় পরীক্ষা। কোম্পানি সচিব জি এম সালাহউদ্দিনের ভাষ্য, বাজারের চাহিদার তুলনায় বর্তমানে গ্যাসের পরিমাণ কম হলেও জাতীয় পাইপলাইন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা শিল্পের জন্য ইন্ট্রাকো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্পে গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বাড়বে। তবে এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, লাইসেন্স, যানবাহনের মান যাচাই এবং গ্যাসের মূল্য—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। ইন্ট্রাকোর বহর পুনরায় চালু হওয়া সেই বিকল্প ব্যবস্থাকে কিছুটা গতি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করবে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ও এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।
