দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হলেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কার্যক্রম সচল রেখে উৎপাদন ধরে রেখেছে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি। বর্তমানে কোম্পানিটি তার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০% ব্যবহার করে সুতা উৎপাদন করছে।
শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের দৈনিক সুতা উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭০ টন। এর বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪২ টন। কোম্পানিটির দুটি উৎপাদন ইউনিটে মোট প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার স্পিন্ডল রয়েছে।
কোম্পানি কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বর্তমান সক্ষমতার প্রায় ৯৮% পর্যন্ত উৎপাদনে ফিরতে পারবে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। ফলে বিদ্যুৎ সংকট কাটলে নতুন করে বড় ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে উৎপাদন ও বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
ফার গ্রুপের ম্যানেজার, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সুদীপ বনিক বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘ সময় ধরে বিঘ্ন ঘটছে। তিনি বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টাই আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। বিদ্যুৎ না থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। গত এক বছর ধরে আমরা এ সমস্যার মধ্যে আছি।”
কোম্পানিটি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি ৬ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। এ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত গড়ে প্রায় ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা হয়। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানিটির বিদ্যুৎ ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমাতে সহায়তা করছে।
ইতিবাচক পরিবর্তন: বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবসার জন্য কয়েকটি ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির পণ্যের দাম প্রায় ২০% বেড়েছে। একই সঙ্গে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থার চাপও কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি সরকার রপ্তানি প্রণোদনা ১% থেকে বাড়িয়ে ৫% করেছে।
সুদীপ বনিক বলেন, “আমাদের পণ্যের দাম প্রায় ২০% বেড়েছে। একই সময়ে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থার চাপ কিছুটা কমেছে। সরকারও রপ্তানি প্রণোদনা ১% থেকে ৫% করেছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও আমাদের ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।”
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান নতুন অর্ডার নিতে না পারায় শার্প ইন্ডাস্ট্রিজও এর সুফল পাচ্ছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের অর্ডার ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে কোম্পানিটির প্রধান সমস্যা বাজারে চাহিদার ঘাটতি নয়, বরং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারা। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে হাতে থাকা অর্ডার দ্রুত পূরণের পাশাপাশি নতুন অর্ডার নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
শেয়ারে উত্থান: চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারে সাম্প্রতিক সময়ে বড় উত্থান হয়েছে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জুন শেয়ারটির দাম ছিল ১৭ টাকা। ১২ আগস্ট তা বেড়ে ৪৪ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রায় আট সপ্তাহে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ১৫৬ শতাংশ। সর্বশেষ লেনদেনে দাম কমে ৩৭ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। শেয়ারদর ও লেনদেনে অস্বাভাবিক উত্থানের পর ডিএসই ১১ আগাস্ট কোম্পানিটির কাছে ব্যাখ্যা চায়। জবাবে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ জানায়, শেয়ারদরের এমন উত্থানের পেছনে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবর্তন বা অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (চঝও) নেই।
নতুন বিনিয়োগ: উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ দ্বিতীয় উৎপাদন ইউনিটে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। টার্ম লোন ও কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নের সমন্বয়ে এ বিনিয়োগ করা হয়। ইউনিটটি গত বছর উৎপাদনে যায়। তবে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন ইউনিটটির সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়লে নতুন করে বড় বিনিয়োগ ছাড়াই বিদ্যমান ইউনিট থেকেই উৎপাদন বাড়াতে পারবে কোম্পানিটি। ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নতুন একটি রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের। এর জন্য জমি বরাদ্দ করা হলেও বর্তমান ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পিছিয়ে রয়েছে।
আরএন স্পিনিং মিলস এবং সামিন ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলস একীভূত হয়ে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ গঠিত হয়। ২০১৯ সালে অগ্নিকাণ্ডের পর আরএন স্পিনিংয়ের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে ছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট একীভূতকরণ অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদন দেয়। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ নামে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু হয়। একীভূতকরণের মাধ্যমে কোম্পানিটি পুনরায় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ পেলেও আগের ব্যবসার লোকসানের চাপ এবং বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
নতুন সম্ভাবনা: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের আয় হয়েছে প্রায় ২৫৭ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ২.১৬ টাকা। মার্চ ২০২৬ শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ছিল ৭.৯২ টাকা। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। এ সময়ে লোকসান হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও ছয় মাসের নিশ্চিত অর্ডার, পণ্যের দাম বৃদ্ধি, রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ানো এবং ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থার চাপ কমে আসা কোম্পানিটির সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বিদ্যমান সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারবে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। এতে নিশ্চিত অর্ডার পূরণের পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগীদের উৎপাদন ঘাটতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন অর্ডার নেওয়া এবং বিক্রি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট কোম্পানিটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকা এবং বাজারে অর্ডারের চাপ বাড়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে।
