শক্তিশালী অথরিটির অভাবে ধুঁকছে ‘নিরাপদ খাদ্য’

ফন্ট সাইজ:

বাজারে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। কখনো বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), কখনো বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), আবার কখনো জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি)- সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত বাজারে অভিযান পরিচালনা করছে। জরিমানা, প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবুও ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যের প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বের বিভাজন ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। বিশ্বের অনেক দেশে খাদ্যমান ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরপাদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ ১৬টি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে বিভক্ত।

পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব ও তথ্যের সমন্বয়, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন, খাদ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং দ্রুত প্রত্যাহার ব্যবস্থায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে একটি খাদ্যপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্ব্বিত নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। খাদ্যের মান নির্ধারণ ও পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা বিএসটিআই এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বিএফএস পৃথক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত। তাই সমন্বিতভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোর মতো শক্তিশালী, স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন ফুড সেফটি অথরিটি প্রতিষ্ঠিত হলে খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে খাদ্যমান ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেয়া গেলে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মহাপরিচালক বা চেয়ারম্যানরা সচিব বা গ্রেড-১ পর্যায়ের কর্মকর্তা।

কিন্তু নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাধারণত অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এ কারণে আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় ও নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃত্বের ঘাটতি হচ্ছে।
তিন সংস্থা, তিন ধরনের দায়িত্ব: নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে দেশের বড় তিনটি সংস্থা তিন ধরনের দায়িত্ব পালন করছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) দেশের জাতীয় মান নির্ধারণ, পণ্যের মান পরীক্ষা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সার্টিফিকেশনের দায়িত্ব পালন করে। কোনো খাদ্যপণ্যের জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড (বিডিএস) নির্ধারিত থাকলে সেই পণ্য নির্ধারিত স্পেশিফিকেশন ও কোয়ালিটি প্যারামিটার পূরণ করছে কি না- তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) মূল দায়িত্ব হলো নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। এ ছাড়া ক্ষতিকর রাসায়নিক, জীবাণু, হেভি মেটাল ও অন্যান্য কেমিক্যালজনিত সমস্যা আছে কি না তা নজরদারি করাও তাদের কাজের অংশ। অপরদিকে, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব হলো- পণ্যের অতিরিক্ত দাম নেয়া, ভেজাল বা নকল পণ্য বিক্রি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, পণ্যের মোড়কে সঠিক তথ্য না দেয়া, ওজনে কম দেয়া হয়েছে কি না নজরদারি করা। এ ছাড়া প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা না দেয়া, ভোক্তাকে প্রতারণা এসব বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত্ত করা এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা/ব্যবস্থা নেয়াও এ সংস্থার কাজ। গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সংস্থার সমন্বয় না থাকলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী, স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ), ক্যানাডিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফুড সেফটি অথরিটি। তারা খাদ্য নিরাপত্তাকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের মধ্যে সমন্ব্বয় নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকে। শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় নয়, বরং ভেজাল খাদ্যের উৎস শনাক্ত করে উৎপাদন পর্যায় থেকে বাজার পর্যন্ত্ত একটি সমন্ব্বিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, আমাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আইনের যে বিধিবিধান রয়েছে তার প্রতিফলন হচ্ছে না।

কারণ দেশে আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। এজন্য অনেকেই অপকর্ম করে পার পেয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ১৬টি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো সমন্বয় নেই। যে যার যার মতো কাজ করছে। একটি প্রতিষ্ঠানে আজ ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর যাচ্ছে, কাল নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর, পরদিন বিএসটিআই যাচ্ছে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে কো-অর্ডিনেশন নেই। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সবার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোর ইন্টারনাল কো-অর্ডিনেশনগুলো জোরদার করা উচিত। অভিযানের ফলোআপগুলো ঠিকমতো রাখা উচিত। কাজের মান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুব কবির মিলন মানবজমিনকে বলেন, একসময় পৃথিবীর সব দেশের ফুড চেইন ভেজাল ছিল। কোনো কোনো দেশে আমাদের থেকেও বেশি ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব দেশ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কোনো কোনো দেশ একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে। কারণ তারা শক্তিশালী ফুড সেফটি অথরিটি তৈরি করতে পেরেছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, কানাডিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফুড সেফটি অথরিটি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এনভারমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সি।

আন্তর্জাতিক মানের নীতিমালা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে বাংলাদেশেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। আমাদের ফুড সেফটি অথরিটিগুলো এমন মন্ত্রণালয়ের আন্ডারে চলে গেছে যাদের সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পর্কই নাই।
কারণ খাদ্য মন্ত্রণালয় ধান, চাল, গম মজুত, সরবরাহ, সংরক্ষণ ও আমদানির সঙ্গে জড়িত। তাহলে ফুড সেফটি অথরিটি কাজ করবে কীভাবে? পুরো সংস্থাই ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপর নির্ভর। তাদের হাত পুরোপুরি বেঁধে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অন্য সব দপ্তরের হেড তথা ডিজি, সচিব, সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার। কিন্তু ফুড সেফটি অথরিটির সর্বোচ্চ চেয়ারম্যানের পদ একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার। তাহলে তাদের কথা কে শুনবে? কেন শুনবে? খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, বিএসটিআইসহ অন্তত ১৬টি সংস্থার সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকায় এসব সংস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনা বা জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, জেলাগুলোতে অভিযানে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সকলে একসঙ্গে অভিযানে অংশ নেয়। এরপর যেখানে যেভাবে প্রযোজ্য সেখানে সেভাবে জরিমানা করা হয়। আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। এখন সময় এসেছে খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় গঠন করা। তার অধীনে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে আসা। তাহলে ভোক্তার পাশাপাশি ব্যাবসায়ীরাও উপকৃত হবেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা অনেক সময় অভিযোগ করেন, তাদের আলাদা ৫টি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়। সমন্বিত ব্যবস্থা হলে তাদের দুর্ভোগ লাঘব হবে। অপরদিকে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে ঘরে ঘরে ক্যান্সার ও কিডনি রোগী দেখা যাবে। তিনি আরও বলেন, চাহিদা অনুযায়ী আমাদের পর্যাপ্ত লোকবল ও ল্যাব সংকট থাকায় সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত ল্যাব ও লোকবল থাকলে আমরা বড় স্কেলে টেস্ট ও অভিযান চালাতে পারবো। তখন ব্যবসায়ীরা সচেতন হবে এবং ভয়ও পাবে।