দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের বড় জোগান আসে মাছ থেকে। খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যেও মৎস্য খাতের অবদান বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫০.১৮ লাখ টন। একই সময়ে মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে চাষ থেকে। তবে বিপুল উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি এখনো অনেক কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে নয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মাননিয়ন্ত্রণ, ট্রেসিবিলিটি, কোল্ডচেইন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রতি কেজি মাছে বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারলেই মৎস্য খাত বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রপ্তানি শিল্পে পরিণত হতে পারে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও আন্তর্জাতিক বাজার সমপ্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সমপ্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সামপ্রতিক সময়ে সংসদেও তিনি দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে সরকার গবেষণা, সংরক্ষণ ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি মৎস্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে মান নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
সহজ শর্তে ঋণ, মৎস্যবীমা, মানসম্পন্ন পোনা, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও মাঠপর্যায়ে কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মানও উন্নত করা সম্ভব।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম মৎস্য খাতকে খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, মৎস্য খাতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ঋণ সুবিধা দিতে হবে। একই সঙ্গে মাছের পোনা ও খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজাল প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি জানান, কাঁচামাল নয়, মূল্য সংযোজিত পণ্য রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশের বড় সুযোগ রয়েছে প্রক্রিয়াজাত মৎস্যপণ্যে। আধুনিক কোল্ডস্টোরেজ, হিমায়িত পরিবহন, মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, পরীক্ষাগার ও দ্রুত বন্দরসেবা দরকার। জলবায়ু-সহনশীল প্রজাতি, উন্নত হ্যাচারি, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও টেকসই চাষপদ্ধতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গড়ে তুলতে হবে ‘বাংলাদেশি মৎস্যপণ্য’ ব্র্যান্ড।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু উৎপাদন যথেষ্ট নয়; খাদ্যনিরাপত্তা, ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষাগারে মান যাচাই এবং পণ্যের উৎস শনাক্ত করার সক্ষমতা থাকতে হবে। পানির তাপমাত্রা, অক্সিজেন, পিএইচ ও অ্যামোনিয়ার মাত্রা পরিমাপে কম খরচের সেন্সর ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহ ও ডিজিটাল খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় কমানো সম্ভব। রোগ শনাক্তকরণেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
