প্রবীণদের সেবায় এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ জেবিএফআরএইচ

ফন্ট সাইজ:

প্রবীণদের কথা চিন্তা করে নারায়ণগঞ্জস্থ রূপগঞ্জ থানা রোডে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটারায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটাল (জেবিএফআরএইচ)। প্রতিষ্ঠানটি প্রবীণদের জন্য আধুনিক আবাসন ও চিকিৎসাসেবাকে একসঙ্গে নিশ্চিত করেছে। জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখানে সার্ভিস দেয়া হচ্ছে। জীবনের শেষ সময়টা একটু ভালো ও সুন্দরভাবে কাটানোর লক্ষ্যেই বেসরকারি উদ্যোগে এই জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রথম নিয়মিত বাসিন্দা বাংলা একাডেমির সাবেক সভাপতি ও বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এই গুণী মানুষটি এখানকার বিশেষ পরিচর্যায় রয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমানে ৩৯ জন প্রবীণ এখানে নিয়মিত বসবাস করছেন। এদের মধ্যে ৭ জনকে হাসপাতালের শয্যায় রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা রোডে (পূর্বাচলের কাছে) ১০ বিঘা জমির উপর গড়ে উঠেছে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটারায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটালটি। ২০২৪ সালের ২০শে ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি প্রবীণদের জন্য আধুনিক আবাসন ও চিকিৎসাসেবাকে একসঙ্গে নিশ্চিত করেছে। প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য এখানে রয়েছে সুইমিংপুল, জ্যাকুজি ও স্টিমবাথ, আধুনিক জিম ও ফিজিওথেরাপি সেন্টার, চিকিৎসা পরীক্ষার ল্যাব, লাইব্রেরি ও মুভি থিয়েটার, ইয়োগা ও স্পিরিচুয়াল ওয়েলনেস সেন্টার, নদীতে ভ্রমণ (রিভার ক্রুজ) ও আড্ডার আয়োজন। এ ছাড়া যারা বিছানাকেন্দ্রিক, তাদের জন্য রয়েছে ১৫০ শয্যার কেয়ার সেন্টার। আর জটিল রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য রয়েছে ৮০ শয্যার ‘পেলিয়েটিভ ও হসপিস কেয়ার’ ইউনিট। পাঁচতলা বিশিষ্ট চারটি সাদা ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে এই রিটারায়ারমেন্ট হোম। ভবনগুলোর নাম রাখা হয়েছে দেশের চারটি নদীর নামে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুরমা। এখানে রয়েছে ২৩২টি আধুনিক স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট। প্রতিটি ভবন থেকে করিডোর, লিফট ও হুইলচেয়ারের মাধ্যমে সহজেই ছাদে যাওয়া যায়। ছাদ জুড়ে রয়েছে ফুল, লতাগাছ ও সবুজ বাগান। আশপাশে উঁচু ভবন কম থাকায় চারদিকে খোলা পরিবেশ ও সবুজের সমারোহ। বাসিন্দারা নিজ ঘরেই ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক, নার্স ও প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারের সেবা পান।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক সরদার এ নাঈম। তিনি ১৯৯১ সালে দেশে প্রথম ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি চালু করেন। পরে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে সেখানকার প্রবীণদের জন্য উন্নত সেবাব্যবস্থা দেখে অনুপ্রাণিত হন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জাপানি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় তিনি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অধ্যাপক নাঈম বলেন, প্রবীণদের জীবনের শেষ সময়টা একটু ভালো ও সুন্দরভাবে কাটানোর লক্ষ্যেই এই জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল ও রিটায়ারমেন্ট হোম প্রস্তুত করেছি। এখানে আমি আমার মা ও শ্বশুরকেও রেখেছি। এখানে প্রবীণরা নিরাপদ পরিবেশে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা পান। তবে এটি মূলত উচ্চবিত্ত মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছে। এটি আমার একটি স্বপ্ন; আমার ইচ্ছা এই ধরনের আরও অনেক উদ্যোগ দেশে গড়ে উঠুক, প্রবীণদের জীবনের শেষবেলা একটু স্বস্তির মধ্যদিয়ে পার হোক এবং এই খাতে পেশাগত পরিবর্তন আসুক। এমনকি সরকারিভাবেও এমন উদ্যোগ নেয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশিক-উর-রহমান বলেন, আমরা শুধু এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবীণদের সেবা নিশ্চিত করছি না, বরং প্রবীণদের পরিচর্যায় দেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করছি। এতে দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদেশেও চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ লোক পাঠানো সম্ভব হবে।

এখানে থাকতে মাসে মোটামুটি যে খরচ হয় স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া, পাঁচ বেলার খাবার, চিকিৎসা ও নার্সিং সেবাসহ মৌলিক খরচ মাসে প্রায় ৯৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় স্থায়ীভাবে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনার সুযোগও রয়েছে। ইতিমধ্যে ২৩২টির মধ্যে একশ’টি অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়ে গেছে।