সীতাকুণ্ড জাহাজভাঙা শিল্পে ১২ বছরে ১৪৮ মৃত্যু

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজভাঙা শিল্পে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা, আহত হয়ে অনেকে পঙ্গুত্ববরণও করছেন। সর্বশেষ শুক্রবার ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আবারো প্রশ্ন উঠেছে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ১৪৮ জন শ্রমিক নিহত এবং ২৭৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন এবং আহত হয়েছেন ৪০ জন।

বিলসের ডিটিডিএ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টু জানান, ২০২৫ সালে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় চারজন নিহত ও ৫৪ জন আহত হন। ২০২৪ সালে নিহত হন ৭ জন, আহত ২২ জন। ২০২৩ সালে ৭ জন নিহত ও ২৮ জন আহত হন। ২০২২ সালে নিহত হন ৭ জন। এর আগের বছরগুলোতে ২০২১ সালে ১৩ জন নিহত ও ৪৩ জন আহত, ২০২০ সালে ১০ জন নিহত ও ২৯ জন আহত, ২০১৯ সালে ২৩ জন নিহত ও ৩৪ জন আহত, ২০১৮ সালে ১৩ জন নিহত ও চারজন আহত, ২০১৭ সালে ১৯ জন নিহত ও ২০ জন আহত, ২০১৬ সালে ১৮ জন নিহত ও ৫ জন আহত এবং ২০১৫ সালে ১৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকেরা জানান, স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় শ্রমিক আহত ও নিহত হচ্ছেন। কখনো রাডার ভেঙে পড়ে, কখনো ম্যাগনেটের হুক লাগাতে গিয়ে শ্রমিক আহত হন।

এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ড, ভারী লোহার খণ্ড পড়ে যাওয়া, অক্সিজেন টিউবের জয়েন্ট বিস্ফোরণ, কাটিংয়ের সময় আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়া এবং বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ জানান, ঝুঁকি নিয়েই শ্রমিকেরা জাহাজভাঙা শিল্পে কাজ করছেন। এখানে নিরাপত্তা বড় সমস্যা। তার মতে, শুধু ইয়ার্ড মালিকপক্ষ নয়, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাগুলোরও দায় রয়েছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া শ্রমিকদের জাহাজ কাটার কাজে নামানোর কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। এদিকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রিন শিপইয়ার্ডগুলোতে সাধারণ ইয়ার্ডের তুলনায় বেশি নিয়মকানুন অনুসরণ করার কথা। কিন্তু গ্রিন হিসেবে স্বীকৃত ফেরদৌস স্টিলেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৮ শ্রমিকের মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিপ ব্রেকিং শিল্পের শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গ্রিন ও সাধারণ-দুই ধরনের ইয়ার্ডেই অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে জাহাজ কাটার কাজ ঠিকাদারদের মাধ্যমে করানো হয়।

মূল ঠিকাদার আবার সাব-ঠিকাদার নিয়োগ করেন। দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ এবং খরচ কমানোর প্রবণতায় অনেক সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি নিশ্চিত না করেই শ্রমিকদের জাহাজ কাটার কাজে নামানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রাত ৮টার পর জাহাজ কাটার বিষয়ে নির্দেশনা থাকলেও অনেক ইয়ার্ডে তা মানা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুর্ঘটনার পর ঘটনাটি গোপন করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলোর। শুক্রবার নিহত শ্রমিক শুভ দাসের ভাই অভিযোগ করেন, আহত শ্রমিকেরা সময়মতো চিকিৎসা পাননি। তার দাবি, কারখানাটিতে নিজস্ব এম্বুলেন্স ছিল না। দুর্ঘটনার পর কারখানার প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয় এবং মালিকপক্ষ ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়া না হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এদিকে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির গ্যাস ফ্রি ও ক্লিনিং সার্টিফিকেট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফেরদৌস শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফেরদৌস ওয়াহিদ।

মানবজমিনকে তিনি বলেন, বিক্রেতা পক্ষ থেকে তাদের গ্যাস ফ্রি ও ক্লিনিং সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছিল। এখন এসব সনদ আইনি ও নীতিগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা হবে। ফেরদৌস ওয়াহিদের ভাষ্য, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাহাজভাঙা বা স্ক্র্যাপ করার উদ্দেশ্যে বিক্রির আগে জাহাজ সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করে দেয়া এবং গ্যাস ফ্রি ও ক্লিনিং সার্টিফিকেট দেয়া নিয়মের অংশ। বিক্রেতা পক্ষ তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে দু’টি সনদই দিয়েছিল। সেই সনদের ওপর ভিত্তি করেই জাহাজটির পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হয়।

তিনি বলেন, একটি জাহাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশের মধ্যে ইঞ্জিন রুম ও পাম্প রুম অন্যতম। শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ওই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর কাজ প্রথমেই সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে জাহাজে অতিরিক্ত মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়ার পর বিক্রেতা পক্ষের দেয়া সনদের যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, “বিক্রেতা পক্ষের দেয়া সনদ সঠিক ছিল কি না, তা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাই গ্যাস ফ্রি ও ক্লিনিং সার্টিফিকেটের বিষয়টি আইনি ও নীতিগতভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।”

প্রসঙ্গত, একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে ছোট-বড় প্রায় ১৬০টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল। বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ২৩টি। এসব ইয়ার্ডই গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) সূত্রে জানা গেছে, চালু থাকা এসব ইয়ার্ডে কমপক্ষে ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন।