পাইপলাইন বসানো হয়েছে, সিটিগেট ও সরবরাহ কেন্দ্র নির্মাণ শেষ। শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত গ্যাসের লাইনও পৌঁছে গেছে। গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজনীয় রেগুলেটিং, মিটারিং ও ডিআরএস নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এরপরও প্রায় তিন বছর ধরে নীলফামারীর কোনো শিল্পকারখানায় দেয়া হয়নি সরকারি গ্যাস সংযোগ। ফলে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো পড়ে আছে অচল অবস্থায়। আর গ্যাসের জন্য বাড়তি খরচ গুনছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ২০২৩ সালের মধ্যে নীলফামারীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কাজও শেষ হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় হতাশা বাড়ছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
একইসঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে জেলার শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। জানা যায়, নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন, তিনটি গ্যাস স্টেশন নির্মাণ এবং বিভিন্ন নদী-খাল ক্রসিংসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাজ সম্পন্ন করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা, যা প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়েও বেশি। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও গ্যাসের সুফল পাচ্ছে না নীলফামারীর শিল্পাঞ্চল।
সৈয়দপুরে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) সিটিগেট গ্যাস সঞ্চালন কেন্দ্র এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস সরবরাহ কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) সরবরাহ কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। তবে এখনো শুরু হয়নি কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিটিসিএল ইতিমধ্যে রেগুলেটিং ও মিটারিংয়ের কাজ শেষ করেছে। পিজিসিএলের সরবরাহ কেন্দ্র্রের ডিআরএস নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি উত্তরা ইপিজেড ও সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরী পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। তারপরও গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। সরজমিন দেখা যায়, সৈয়দপুরের সিটিগেট ও গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রের প্রধান ফটক বন্ধ। নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া সেখানে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। ফলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও কেন গ্যাস সরবরাহ শুরু হচ্ছে না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, সৈয়দপুর সিটিগেট স্টেশন ও সরবরাহ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ও অবকাঠামো দুটোই প্রস্তুত।
শুধু সংযোগ না থাকায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। রয়েল রিলাক্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ও রানু এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজু পোদ্দার ও সুশান্ত কুমার বলেন, কেবল আশ্বাস দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবে গ্যাস সরবরাহ শুরু না হলে জেলার শিল্প খাত ক্ষতির মুখেই থাকবে। গ্যাস সংযোগ পেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, নতুন কারখানা গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হচ্ছে। সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, বিসিক শিল্পনগরী সৈয়দপুরে ১০ দশমিক ৯৩ একর জমিতে অবস্থিত। এখানে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিসিকের সামনে পর্যন্ত পাইপলাইন বসানো হয়েছে। আমরা একাধিকবার পিজিসিএলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিমের। তিনি বলেন, আমরা স্টেশন পেয়েছি, লাইন পেয়েছি, গ্যাস পাচ্ছি না। সবার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমিও বলতে চাই, যত দ্রুত সম্ভব সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিবে।
