হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের নিরাপদ সুপেয় পানির স্বপ্ন আজ যেন তালাবদ্ধ একটি প্রকল্পের দেয়ালে বন্দি হয়ে আছে। প্রায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক পানি শোধনাগার ও ওভারহেড পানির ট্যাংক প্রকল্পটি উদ্বোধনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেটে গেছে টানা ১৪ মাস। দীর্ঘদিন ব্যবহারের বাইরে পড়ে থাকায় কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরতে শুরু করেছে, ধুলার স্তরে ঢেকে যাচ্ছে শোধনাগারের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন প্রকল্পটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, প্রকল্পটি চালু না থাকায় নিরাপদ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পৌর এলাকার শত শত পরিবারকে। সমপ্রতি পৌর শহরের সুদিয়াখলা এলাকার পুরাতন গরুর বাজার সংলগ্ন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দূর থেকে দৃষ্টিনন্দন বিশাল ওভারহেড পানির ট্যাংকটি এখনও দাঁড়িয়ে থাকলেও তার নিচের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানি শোধনাগার ভবনের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা।
চারপাশে নেই কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কার্যক্রম। ভবনের ভেতরে থাকা অত্যাধুনিক পানি শোধন যন্ত্রপাতি ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বিভিন্ন ধাতব অংশে মরিচা পড়তে শুরু করেছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন অচল থাকায় প্রকল্পের যন্ত্রপাতি দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে শায়েস্তাগঞ্জ পৌর এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দেয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপে পানি ওঠে না। অনেক পরিবারকে কয়েকশ মিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে অনিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এই সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক পানি সরবরাহ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। প্রকল্প চালুর খবর শুনে পৌরবাসীর মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাড়ে ৪০০ কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার ওভারহেড পানির ট্যাংক ও পানি শোধনাগারটি নির্মাণ করে এবিএম ওয়াটার কোম্পানি লিমিটেড।
নির্মাণকাজ শেষে ২০২৫ সালের ৩রা মার্চ প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২৮শে এপ্রিল জাঁকজমকপূর্ণভাবে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর কয়েক সপ্তাহ পানি সরবরাহ চালু থাকলেও মাত্র এক মাসের মাথায় তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পানি শোধনের জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল সরবরাহ, কারিগরি সহায়তা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রকল্পটি সচল রাখা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু সাঈদ বলেন, নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করে নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটি পৌরসভার কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পানি সরবরাহ কার্যক্রম চালুর সম্পূর্ণ দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের।
প্রশাসনের আশ্বাস শায়েস্তাগঞ্জ পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ, যন্ত্রপাতি পরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষ করে আগামী দুই মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে পানি সরবরাহ চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পানি শোধনাগারের যন্ত্রপাতি নিয়মিত সংরক্ষণ না করলে সেগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এতে ভবিষ্যতে প্রকল্পটি চালু করতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই যেকোনো জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি এর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ও অর্থায়নের পরিকল্পনা আগে থেকেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
