সুইজারল্যান্ডে অভিবাসনের উল্টো স্রোত: স্বপ্নের দেশে সবাই স্থায়ী হয় না

সুইজারল্যান্ডে অভিবাসনের উল্টো স্রোত: স্বপ্নের দেশে সবাই স্থায়ী হয় না

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বজুড়ে সুইজারল্যান্ডের পরিচিতি একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও উচ্চ জীবনমানের দেশ হিসেবে। উন্নত কর্মপরিবেশ, আকর্ষণীয় বেতন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি কর্মীদের কাছে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। সাধারণ ধারণা হলো, একবার কেউ সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ পেলে সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে চান। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সুইস স্টেট সেক্রেটারিয়েট ফর মাইগ্রেশনের (এসইএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৪০ হাজার বিদেশি স্থায়ী বাসিন্দা সুইজারল্যান্ড ছেড়ে গেছেন। সংখ্যাটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সাল থেকে বিদেশি বাসিন্দাদের দেশত্যাগ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সময়ে নতুন অভিবাসীর আগমনও কমেছে।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে ৭৪ হাজার ১১২ জন বিদেশি সুইজারল্যান্ডের স্থায়ী বাসিন্দাদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ কম। মোট অভিবাসন ও দেশত্যাগের ব্যবধান বা নিট অভিবাসন ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ২৯ হাজার ৮৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। জুনের শেষে দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ লাখ ৩০ হাজার যা সুইজারল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি।

অভিবাসন কি একমুখী যাত্রা?
উন্নত বিশ্বের অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায়ই এমন একটি চিত্র তুলে ধরা হয়, যেন বিদেশিরা একবার প্রবেশ করলে আর ফিরে যান না। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও গতিশীল। সুইজারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায়, অভিবাসন কেবল আগমনের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে আগমন, অবস্থান, চলাচল এবং প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া।

২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ৩৯ হাজার ২৫১ জন স্থায়ী বিদেশি বাসিন্দা সুইজারল্যান্ড ছেড়েছেন। তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার সদস্যদেশগুলোর নাগরিক। তবে নিজ নিজ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অনুপাতে ভারতীয় ও চীনা নাগরিকদের মধ্যেও দেশত্যাগের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও কানাডার মতো দেশ থেকে আসা উচ্চদক্ষ পেশাজীবীদের বড় একটি অংশ সুইজারল্যান্ডে স্থায়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে আসেন না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইএফটিএর বাইরের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত দেশগুলো থেকে আগত অভিবাসীদের আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সুইজারল্যান্ড ছেড়ে চলে যান।

তাদের অনেকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার, প্রকৌশলী কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মী। নির্দিষ্ট প্রকল্প, পদায়ন বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তারা অন্য কোনো দেশে চলে যান অথবা নিজ দেশে ফিরে যান। ফলে তাদের সুইজারল্যান্ডে অবস্থানকে স্থায়ী অভিবাসনের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

অর্থনীতিই প্রধান নিয়ামক

কর্মসংস্থান এখনো সুইজারল্যান্ডে বিদেশিদের আগমনের সবচেয়ে বড় কারণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইএফটিএ দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের চার-পঞ্চমাংশেরও বেশি কাজের সূত্রে দেশটিতে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এসব দেশ থেকে ৪১ হাজার ৩২১ জন দীর্ঘমেয়াদি চাকরির জন্য সুইজারল্যান্ডে এসেছেন। তবে সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম।

এই সামান্য পতন শ্রমবাজারে সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি, চাকরির সুযোগ, সুইস ফ্রাঁর শক্তিশালী বিনিময়মূল্য, বাড়িভাড়া এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় সবকিছু মিলিয়েই একজন বিদেশি কর্মী সিদ্ধান্ত নেন তিনি থাকবেন, নাকি চলে যাবেন।

সীমান্তবর্তী ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও অস্ট্রিয়া থেকে প্রতিদিন সুইজারল্যান্ডে এসে কাজ করা মানুষের জন্য ইস্যু করা নতুন অনুমতিপত্রও কমেছে। বছরের প্রথমার্ধে ৩৩ হাজার ২১৯টি নতুন ক্রস-বর্ডার কমিউটার পারমিট দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের ৩৬ হাজার ৮৭৬টির তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম। অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি কাজের অনুমতিপত্র কিছুটা বেড়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে নিয়োগদাতারা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে অস্থায়ী ও প্রকল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছেন।

উচ্চ জীবনমানের আড়ালে উচ্চ ব্যয়

সুইজারল্যান্ডের বেতন ইউরোপের অধিকাংশ দেশের তুলনায় বেশি। কিন্তু বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যবিমা, শিশুর পরিচর্যা, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়ও অত্যন্ত বেশি। একটি ভালো বেতন সব সময় আরামদায়ক জীবন নিশ্চিত করে না বিশেষ করে যেসব পরিবারে একজনই উপার্জন করেন অথবা যাঁদের একাধিক সন্তান রয়েছে।

বিদেশিদের জন্য ভাষা, সামাজিক সংযোগ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে পেশাগত অগ্রগতিতে অদৃশ্য বাধার মুখে পড়েন। উচ্চদক্ষ কর্মীদের সামনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা নিজ দেশের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে আরও আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি হলে সুইজারল্যান্ড ছেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ব্যক্তিগত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যাদের জীবনসঙ্গী, সন্তান এবং ঘনিষ্ঠ সামাজিক বন্ধন সুইজারল্যান্ডে গড়ে ওঠে, তাদের স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিপরীতে পরিবার ও সামাজিক শিকড় অন্য দেশে থাকলে ফিরে যাওয়ার আকর্ষণ শক্তিশালী থাকে।


অবসরের পর প্রত্যাবর্তন

অভিবাসীদের দেশত্যাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ অবসর। সুইজারল্যান্ডে উপার্জিত পেনশন এমন কোনো দেশে ব্যয় করলে তার প্রকৃত মূল্য অনেক বেড়ে যায়, যেখানে জীবনযাত্রার খরচ তুলনামূলক কম। আশির দশকে সুইজারল্যান্ডে আসা অনেক পর্তুগিজ কর্মী এখন অবসরে যাচ্ছেন। তাদের একটি অংশ নিজ দেশে ফিরছেন, কারণ সুইস পেনশনে পর্তুগালে তারা অধিক স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করতে পারেন।

এই প্রবণতা শুধু পর্তুগিজদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ ইউরোপ, বলকান অঞ্চল, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক অভিবাসীর কাছেই অবসরের পর নিজ দেশে ফেরা অর্থনৈতিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই আকর্ষণীয়। জন্মভূমির আবেগ, পারিবারিক বন্ধন এবং কম জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের জন্য যে শিক্ষা

বাংলাদেশি সমাজে ইউরোপে অভিবাসনকে প্রায়ই স্থায়ী সাফল্যের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের পরিসংখ্যান বলছে, উন্নত দেশে বসবাস মানেই অনিবার্যভাবে সেখানে শিকড় গেড়ে ফেলা নয়। আধুনিক অভিবাসী একই জীবনে একাধিক দেশে কাজ করতে পারেন, দক্ষতা অর্জন করতে পারেন এবং সুবিধাজনক সময়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন।

বাংলাদেশ যদি দক্ষ প্রবাসীদের প্রত্যাবর্তনের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে এই বৈশ্বিক গতিশীলতা দেশের জন্য সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। স্বচ্ছ প্রশাসন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, মানসম্মত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, পেশাগত মর্যাদা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্র নিশ্চিত করা গেলে বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, পুঁজি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের উন্নয়নে যুক্ত হতে পারে।

একই সঙ্গে বিদেশগামী বাংলাদেশিদেরও অভিবাসনকে শুধু স্থায়ী বসবাসের প্রকল্প হিসেবে না দেখে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের একটি পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২০১১ সালে সুইজারল্যান্ডে আসা বিদেশিদের প্রায় ২০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যেই দেশটি ছেড়ে গিয়েছিলেন। পাঁচ বছরের মধ্যে চলে যান ৩৫ শতাংশ; আর দশ বছর পর প্রায় অর্ধেকই আর সেখানে ছিলেন না। এই পরিসংখ্যান একটি গভীর সত্য সামনে আনে অভিবাসন কোনো সরল বা একমুখী পথ নয়।

সুইজারল্যান্ড অনেকের গন্তব্য, কিন্তু সবার শেষ ঠিকানা নয়। কেউ আসেন চাকরির জন্য, কেউ নির্দিষ্ট প্রকল্পে, কেউ উচ্চশিক্ষা বা গবেষণায়; আবার কেউ কয়েক বছর পর নতুন সুযোগের সন্ধানে অন্যত্র চলে যান। বিশ্বায়নের যুগে মানুষ শুধু দেশান্তরিত হচ্ছে নামানুষ ক্রমাগত সুযোগ, নিরাপত্তা, সম্পর্ক এবং জীবনের অর্থের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে। সেই অনুসন্ধানে সুইজারল্যান্ড কখনো স্থায়ী ঠিকানা, কখনো গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় আর কখনো কেবল সাময়িক বিরতি।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]