মক্কা শুধু মুসলমানদের পবিত্রতম নগরী নয়, এটি ঐক্য, আস্থা ও অভিন্ন পরিচয়েরও প্রতীক। সেই নগরীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ তাই নিছক একটি সামরিক সমঝোতা নয়। এটি এমন এক সময়ে আঞ্চলিক শক্তির নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনিশ্চিত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে এবং ইরান, ইসরাইল, ভারত ও উপসাগরীয় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, তিন সদস্যের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ বলে বিবেচনা করা হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই অন্য দুই দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে নেমে পড়বে। সহায়তার ধরন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কূটনৈতিক সহযোগিতা, সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা কিংবা প্রয়োজন অনুসারে সরাসরি সামরিক সহযোগিতা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকারের ভিত্তিতে গঠিত বলে সদস্যরা দাবি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে চুক্তিটির এই প্রতিরক্ষামূলক চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কেন এই চুক্তি
মক্কা চুক্তির জন্ম আকস্মিক নয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তার জন্য মূলত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার, ইরাক যুদ্ধের পরিণতি, গাজা সংঘাত, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে হুতি হামলা এই প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে যে সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র কতটা দ্রুত ও নিঃশর্তভাবে তার আঞ্চলিক মিত্রদের পাশে দাঁড়াবে।
সৌদি আরব তাই যুক্তরাষ্ট্রকে পরিত্যাগ না করেও নিরাপত্তার বিকল্প ভিত্তি গড়ে তুলতে চাইছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান এই পরিকল্পনার স্বাভাবিক অংশীদার। তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী এবং ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ ও সাঁজোয়া যান নির্মাণে দ্রুত অগ্রসরমান শক্তি। পাকিস্তান একটি পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র, যার সেনাবাহিনীর দীর্ঘ যুদ্ধ ও প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সৌদি আরবের হাতে রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য, জ্বালানি সম্পদ, বিনিয়োগ ক্ষমতা এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক প্রভাব। ফলে তিন দেশের সক্ষমতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন ভাষা
রাজনৈতিক দিক থেকে মক্কা চুক্তি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রথমত, মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা আলোচনায় আরব রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভূমিকা আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ছে। এত দিন আরব লীগের নিরাপত্তা উদ্যোগ প্রধানত আরব রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ছিল। মক্কা চুক্তি আরব পরিচয়ের পরিবর্তে বৃহত্তর মুসলিম কৌশলগত সহযোগিতাকে সামনে এনেছে।
দ্বিতীয়ত, এটি সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য রূপান্তর। আরব বসন্ত, মিসরের রাজনৈতিক পরিবর্তন, কাতার অবরোধ এবং মুসলিম ব্রাদারহুড প্রশ্নে একসময় রিয়াদ ও আঙ্কারা পরস্পরের বিপরীত অবস্থানে ছিল। এখন উভয় দেশ উপলব্ধি করছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত সহযোগিতা বেশি লাভজনক।
তৃতীয়ত, পাকিস্তান প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল নিরাপত্তাব্যবস্থায় একটি আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রীয় অবস্থান পাচ্ছে। ইসলামাবাদের জন্য এটি কেবল সামরিক মর্যাদার বিষয় নয়। এর মাধ্যমে পাকিস্তান সৌদি বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারবে।
তবে এই রাজনৈতিক ঐক্যের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তুরস্কের স্বার্থ সিরিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, ককেশাস ও ন্যাটোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পাকিস্তানের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ ভারত ও আফগানিস্তানকেন্দ্রিক। সৌদি আরবের অগ্রাধিকার ইরান, ইয়েমেন, উপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং জ্বালানি অবকাঠামো। অর্থাৎ তিন দেশের শক্তি একত্রিত হলেও তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বা হুমকির সংজ্ঞা অভিন্ন নয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার অদৃশ্য ভিত্তি
কোনো প্রতিরক্ষা জোট শুধু অস্ত্রের ওপর টিকে থাকে না। এর পেছনে প্রয়োজন শিল্প, অর্থায়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা। এই জায়গাতেই মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।
সৌদি আরব তার ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির অধীনে অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে শিল্প, প্রযুক্তি, পর্যটন ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সম্প্রসারিত করতে চায়। দেশটি ভবিষ্যতে ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি ও উৎপাদন অভিজ্ঞতা এখনো সীমিত।
তুরস্ক এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। দেশটি যুদ্ধ ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌযান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সৌদি বিনিয়োগ ও তুর্কি প্রযুক্তির সমন্বয়ে যৌথ প্রতিরক্ষা কারখানা, গবেষণাগার এবং রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তান দিতে পারে দক্ষ ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের প্রকৌশলী, প্রশিক্ষিত সামরিক জনবল, গোলাবারুদ উৎপাদনের সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা গবেষণার অভিজ্ঞতা। বিনিময়ে সৌদি বিনিয়োগ পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি চাহিদা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
তিন দেশের এই সহযোগিতা শুধু সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্বালানি, বন্দর, পরিবহন, খাদ্যনিরাপত্তা, খনিজ সম্পদ, মহাকাশ প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সম্প্রসারিত হতে পারে। তুরস্কের শিল্পভিত্তি, পাকিস্তানের শ্রম ও ভৌগোলিক অবস্থান এবং সৌদি আরবের মূলধন একত্রিত হলে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াকে সংযুক্তকারী নতুন অর্থনৈতিক করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কৌশলগত তাৎপর্য
মক্কা চুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো তিন দেশের ভৌগোলিক অবস্থান। তুরস্ক ইউরোপ, কৃষ্ণসাগর, ভূমধ্যসাগর ও ককেশাসের প্রবেশদ্বার। সৌদি আরব পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও আরব উপদ্বীপের কেন্দ্রীয় শক্তি। পাকিস্তান আরব সাগর, ভারত মহাসাগর, চীন, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত।
এই বিস্তৃত ভৌগোলিক বলয় হরমুজ প্রণালি, বাব আল মান্দেব, লোহিত সাগর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের জ্বালানি ও পণ্যবাণিজ্যের বড় অংশ এসব পথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে চুক্তিটি কার্যকর হলে তা শুধু সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ড নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত হবে।
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ড্রোন প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা গেলে এই জোট বাস্তব প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করতে পারে। প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ গবেষণা ও উৎপাদন বিদেশি অস্ত্র সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতাও কমাবে। ইতিমধ্যে চুক্তিটিকে ঘিরে যৌথ প্রশিক্ষণ, সেনা বিনিময়, আগাম সতর্কীকরণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা সমন্বয়ের সম্ভাবনা আলোচিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি কি জোটের ছাতা
চুক্তিটি ঘোষণার পর সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা কি সৌদি আরব ও তুরস্কের জন্য সম্প্রসারিত প্রতিরোধের ছাতা হিসেবে কাজ করবে?
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র অন্য কোনো দেশের প্রতিরক্ষায় ব্যবহারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তাই মক্কা চুক্তিকে পারমাণবিক জোট হিসেবে চিহ্নিত করা বিভ্রান্তিকর হবে। তবু পাকিস্তানের পারমাণবিক অবস্থান জোটটিকে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে এখন হিসাব করতে হবে যে তিন দেশের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তা কত দূর যেতে পারে।
এই অস্পষ্টতা প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, আবার ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। সুতরাং সদস্যদের উচিত পারমাণবিক নীতি সম্পর্কে দায়িত্বশীল স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রচলিত সামরিক প্রতিরোধকেই চুক্তির মূল ভিত্তি করা।
ইরান, ইসরাইল ও ভারতের দৃষ্টিতে চুক্তি
তিন সদস্যই বলেছে, মক্কা চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। তুরস্ক ও পাকিস্তানের বক্তব্য অনুযায়ী এটি প্রতিরক্ষামূলক এবং ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতায় আগ্রহী অন্য রাষ্ট্রের জন্যও উন্মুক্ত। কিন্তু ভূরাজনীতিতে ঘোষিত উদ্দেশ্যের পাশাপাশি সক্ষমতা ও অবস্থানও বিবেচিত হয়।
ইরান এটিকে সম্ভাব্য সুন্নি শক্তিবলয় হিসেবে দেখতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত বা ইরানসমর্থিত কোনো গোষ্ঠীর হামলা যদি যৌথ প্রতিরক্ষার বিধান সক্রিয় করে, তাহলে আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েল তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি, পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষমতা এবং সৌদি অর্থশক্তির সমন্বয়কে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করবে।
ভারতের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্পৃক্ততা নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তবে সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয়েরই ভারতের সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তারা পাকিস্তান ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বিরোধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়তে চাইবে না। এই কারণেই কোন পরিস্থিতিকে ‘সশস্ত্র আক্রমণ’ বলা হবে এবং সদস্যদের সহায়তার বাধ্যবাধকতা কতটা তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
মুসলিম বিশ্বের ন্যাটো নয়
মক্কা চুক্তিকে অনেকেই ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলছেন। তুলনাটি আকর্ষণীয় হলেও এখনই যথার্থ নয়। ন্যাটোর রয়েছে সমন্বিত সামরিক কমান্ড, স্থায়ী সদর দপ্তর, অভিন্ন পরিকল্পনা, বহুস্তরীয় কমিটি, মানসম্মত অস্ত্রব্যবস্থা এবং কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা। মক্কা চুক্তি এখনো তিন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রাথমিক কাঠামো।
তদুপরি ন্যাটোর সদস্যদের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ তুলনামূলকভাবে সংজ্ঞায়িত, কিন্তু মক্কা চুক্তির সদস্যদের হুমকির ধারণা ভিন্ন। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় মক্কা চুক্তির দায়বদ্ধতার সঙ্গে ন্যাটোর অঙ্গীকারের কোনো সংঘাত সৃষ্টি হয় কি না, সেটিও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
চুক্তিটির সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হবে স্থায়ী সচিবালয়কে কার্যকর করা, যৌথ সামরিক পরিকল্পনা, বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কাঠামো এবং সহায়তার সুনির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারণ। শুধু শীর্ষ বৈঠক, ঘোষণা ও সামরিক মহড়া দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী জোট নির্মাণ করা যায় না।
সম্ভাবনা ও সতর্কতার সন্ধিক্ষণ
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এটি বাইরের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বাণিজ্যে নতুন সহযোগিতার দ্বার খুলতে পারে।
কিন্তু চুক্তিটি যদি ইরানবিরোধী সাম্প্রদায়িক বলয়ে পরিণত হয়, তাহলে তা নিরাপত্তার পরিবর্তে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। আবার সদস্যরা যদি নিজেদের পৃথক বিরোধে জোটকে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে পারস্পরিক আস্থা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশেষত ভারত ও পাকিস্তান, তুরস্ক ও গ্রিস, কিংবা সৌদি আরব ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরোধে চুক্তির প্রয়োগ নিয়ে অস্পষ্টতা বিপজ্জনক হতে পারে।
মক্কা চুক্তির প্রকৃত শক্তি যুদ্ধ করার সামর্থ্যে নয়, যুদ্ধ প্রতিরোধ করার বিশ্বাসযোগ্যতায়। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কোনো প্রতিপক্ষকে ঘেরাও করা নয়, বরং আক্রমণের মূল্য এত বেশি করে তোলা যাতে সংঘাতের পরিবর্তে কূটনীতিই সবার জন্য যুক্তিসংগত পথ হয়ে ওঠে।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিচার করবে, মক্কার পবিত্র ভূমিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য ও কৌশলগত স্বনির্ভরতার ভিত্তি হয়েছিল, নাকি পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে আরেকটি প্রতীকী ঘোষণা হয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। আপাতত বলা যায়, এটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়; বরং নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্মাণের একটি উচ্চাভিলাষী সূচনা। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সদস্যদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং সবচেয়ে বেশি সংঘাতের পরিবর্তে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]
