সিরিয়ার এক আদালত দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচার আটক, শিশু হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। একই মামলায় তাঁর ভাই মাহের আল আসাদসহ সাবেক শাসনব্যবস্থার আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও দণ্ডিত হয়েছেন। আসাদ বর্তমানে রাশিয়ায় আশ্রিত থাকায় রায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। তবু এটি সিরিয়ার দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাসে একটি প্রতীকী বাঁক।
এই রায় আবারও পুরোনো একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। পৃথিবীর স্বৈরশাসকদের পরিণতি কেন প্রায়ই এত করুণ হয়? কেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে থাকা মানুষকে শেষ পর্যন্ত নির্বাসন, কারাগার, বিচার, মৃত্যুদণ্ড কিংবা জনরোষের মুখোমুখি হতে হয়?
এর উত্তর কেবল একজন শাসকের ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতার মধ্যে নেই। উত্তরটি লুকিয়ে আছে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী মনে করা, রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করা এবং জনগণের নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করার মধ্যে।
দমন থেকে ধ্বংসের পথে সিরিয়া
২০০০ সালে পিতা হাফেজ আল আসাদের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এসে বাশার আল আসাদকে একসময় আধুনিক ও সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বোঝা যায়, মুখ বদলালেও শাসনব্যবস্থার চরিত্র বদলায়নি।
২০১১ সালে দারায় কয়েকজন কিশোর সরকারবিরোধী স্লোগান লেখার কারণে আটক ও নির্যাতনের শিকার হয়। তাদের মুক্তির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে মোকাবিলা না করে গুলি, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করা হয়। সেই দমননীতি দেশটিকে প্রায় চৌদ্দ বছরের গৃহযুদ্ধে ঠেলে দেয়। যুদ্ধে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
রাশিয়া, ইরান এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহায়তায় আসাদ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। কিন্তু বিদেশি মিত্রের শক্তিকে নিজের জনসমর্থন মনে করার ভুল তিনি করেছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাঁর সরকার ভেঙে পড়লে তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলা আসাদ পরিবারের শাসনের অবসান ঘটে প্রায় আকস্মিকভাবে।
স্বৈরশাসনের একটি বড় দুর্বলতা এখানেই। বাইরে থেকে তাকে অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হলেও ভিতরে সে ক্রমাগত ক্ষয় হতে থাকে। জনগণের আনুগত্য নয়, ভয় তার ভিত্তি। আর ভয় যতক্ষণ কাজ করে, শাসন ততক্ষণ অটুট বলে মনে হয়। ভয় ভাঙার পর দেখা যায়, রাষ্ট্রের বিশাল নিরাপত্তাবলয়ও একজন শাসককে রক্ষা করতে পারে না।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ইতালির বেনিতো মুসোলিনি একসময় নিজেকে আধুনিক রোমান সাম্রাজ্যের নির্মাতা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সেনাবাহিনীকে ব্যক্তিগত নেতৃত্বের অধীনে এনে তিনি ইতালিতে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের মুখে পালানোর সময় তিনি ধরা পড়েন এবং নিহত হন। তাঁর মরদেহ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যে নেতা জনতাকে ভয় দেখিয়ে শাসন করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই জনতার প্রতিশোধের প্রতীকে পরিণত হন।
জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, সামরিক শক্তি এবং ব্যক্তিপূজার মাধ্যমে একটি দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বার্লিন পতনের মুখে তিনি আত্মহত্যা করেন। তাঁর তথাকথিত হাজার বছরের সাম্রাজ্য টিকেছিল মাত্র বারো বছর।
রোমানিয়ার নিকোলাই চাউশেস্কু নিজের চারপাশে এমন এক ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে সমালোচনা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ। অথচ ১৯৮৯ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সামনে সেনাবাহিনীর একটি অংশ সরে গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর শাসনের পতন ঘটে। স্ত্রীসহ পালানোর চেষ্টা করেও তিনি ধরা পড়েন এবং সংক্ষিপ্ত বিচারের পর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কয়েক দশক ধরে নিরাপত্তা বাহিনী, যুদ্ধ এবং ভয়ের মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। একসময় যাঁর ছবি দেশের সর্বত্র ছিল, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁকে একটি গোপন আস্তানা থেকে আটক করা হয়। বিচার শেষে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়।
লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিয়াল্লিশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে নিজের পরিবার ও অনুগত গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। ফলে তাঁর পতনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের কার্যকর সাংবিধানিক কাঠামো ছিল না। বিদ্রোহীদের হাতে তাঁর মৃত্যু হয় এবং লিবিয়া দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে।
তবে সব স্বৈরশাসকের পরিণতি মৃত্যু নয়। ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। চিলির অগুস্তো পিনোশে ক্ষমতা হারানোর পর দীর্ঘদিন বিচার ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে ছিলেন। তিউনিসিয়ার জাইন এল আবেদিন বেন আলী দেশত্যাগ করে নির্বাসনে মারা যান। কেউ কারাগারে যান, কেউ নির্বাসিত হন, কেউ আইনের মুখোমুখি হন। কিন্তু প্রায় সবার ক্ষেত্রে একটি বিষয় অভিন্ন: তাঁদের নির্মিত অজেয়তার ভাবমূর্তি শেষ পর্যন্ত টেকেনি।
বাংলাদেশও এই ইতিহাসের বাইরে নয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও ক্ষমতার দম্ভ এবং গণপ্রতিরোধের সংঘাত বারবার দেখা গেছে। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দমনের মাধ্যমে নিজের শাসনকে স্থায়ী করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ছাত্র, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। নূর হোসেন, ডা. শামসুল আলম খান মিলন এবং অসংখ্য আন্দোলনকারীর আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছিল যে দমননীতি সাময়িক নীরবতা তৈরি করতে পারে, স্থায়ী বৈধতা নয়।
বাংলাদেশের আরও সাম্প্রতিক ইতিহাসেও একই শিক্ষা ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার আন্দোলন দমনে কঠোর শক্তি প্রয়োগ করে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে তিনি দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্দোলন দমনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেখ হাসিনা অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সিরিয়া ও বাংলাদেশের ঘটনা এক নয়। দুই দেশের ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান ও সহিংসতার মাত্রার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তবু রাজনৈতিক শিক্ষাটি অভিন্ন। নির্বাচনী বিজয়, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, পারিবারিক পরিচয় কিংবা বিদেশি শক্তির সমর্থন কোনো নেতাকে সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী করে না। জনগণের সম্মতি হারানোর পর রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত শাসক, রাষ্ট্র এবং জনগণ সবার জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনে।
স্বৈরশাসকেরা বাস্তবতা বুঝতে পারেন না কেন
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে একজন শাসকের চারপাশে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়। মন্ত্রী, আমলা, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং প্রচারমাধ্যমের একটি অংশ শাসককে কেবল সেই তথ্যই দেয়, যা তিনি শুনতে চান। সমালোচককে শত্রু এবং ভিন্নমতকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ফলে রাষ্ট্রপ্রধান ধীরে ধীরে বাস্তব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। জনসভায় উপস্থিত ভাড়া করা জনতাকে তিনি জনপ্রিয়তা মনে করেন। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ফলকে গণসমর্থন ভাবেন। সংবাদমাধ্যমের নীরবতাকে শান্তি এবং বিরোধীদের কারাবন্দিত্বকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বলে বিশ্বাস করেন।
স্বৈরশাসন নিজের পতনের পথ নিজেই তৈরি করে। কারণ সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না। নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য না হলে, আদালত স্বাধীন না থাকলে এবং সংসদে বিরোধী কণ্ঠ অনুপস্থিত হলে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের সাংবিধানিক পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন জমে থাকা অসন্তোষ বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
বিচার না প্রতিশোধ
বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভয়াবহ। সিরিয়ার নির্যাতিত মানুষ ন্যায়বিচার চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। স্বৈরশাসকের অপরাধের বিচার যদি তাড়াহুড়া, প্রতিশোধ কিংবা রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, তাহলে নতুন রাষ্ট্রও পুরোনো স্বৈরাচারের পদ্ধতি অনুসরণ করার ঝুঁকিতে পড়ে।
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের স্বচ্ছ উপস্থাপন নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধী যত ঘৃণিতই হোক, তাঁর বিচার আইনের শাসনের ভিত্তিতে হতে হবে। কারণ ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধ এক বিষয় নয়।
সিরিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ কেবল আসাদের শাস্তি নিশ্চিত করা নয়। বরং এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করা, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো আসাদ জন্ম নিতে না পারে। একইভাবে বাংলাদেশের দায়িত্বও শুধু একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতার বিচার সম্পন্ন করা নয়। এমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কোনো সরকার বিচার বিভাগ, পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা ও সংবাদমাধ্যমকে ব্যক্তিগত ক্ষমতার অস্ত্রে পরিণত করতে না পারে।
শেষ শিক্ষা
স্বৈরশাসকেরা সাধারণত মনে করেন, তাঁরা ছাড়া রাষ্ট্র অচল। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, রাষ্ট্র টিকে থাকে, জনগণ টিকে থাকে, স্বৈরশাসক টিকে থাকেন না।
বাশার আল আসাদের মৃত্যুদণ্ড তাই কেবল একজন ক্ষমতাচ্যুত শাসকের বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের রায় নয়। এটি পৃথিবীর সব ক্ষমতাসীন নেতার জন্য একটি সতর্কবার্তা। বন্দুক আনুগত্য কিনতে পারে, ভালোবাসা নয়। কারাগার প্রতিবাদী মানুষকে আটকাতে পারে, ইতিহাসের বিচারকে নয়। বিদেশি মিত্র পতন বিলম্বিত করতে পারে, জনগণের প্রত্যাখ্যান থেকে কাউকে অনন্তকাল রক্ষা করতে পারে না।
ক্ষমতা যত দীর্ঘই হোক, তা চিরস্থায়ী নয়। যে শাসক জনগণের কণ্ঠকে স্তব্ধ করেন, একদিন তাঁর নিজের কণ্ঠই নির্বাসনের নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে যায়। আর যে নেতা নিজেকে রাষ্ট্রের চেয়ে বড় মনে করেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাষ্ট্রের পাদটীকায় নামিয়ে আনে।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
