অন্তরালের রহস্যও খুঁজছে নগর পুলিশ

সিলেটে ট্রিপল মার্ডার

অন্তরালের রহস্যও খুঁজছে নগর পুলিশ

ফন্ট সাইজ:

সিলেটের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা- সেটি খতিয়ে দেখছে নগর পুলিশ। শুধুমাত্র বাবুল মিয়ার প্রেমের ঘটনাই নয়, যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এমনটি জানিয়েছেন, সিলেট নগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। সেজন্য সিনিয়র কর্মকর্তারাও তদন্ত কাজ মনিটরিং করবেন। এদিকে, বাবুল মিয়ার বক্তব্যের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সিসিটিভি ফুটেজে বাবুল মিয়ার উপস্থিতি, ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া, কথা মতো ছুরি উদ্ধার হওয়া, ড্রয়ার থেকে নেয়া টাকা ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করা- সবই ঘটনার ধারাবাহিকতায় মিলে গেছে। সিলেট মেট্রোপলিন পুলিশের এডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার অনেক বিষয় রয়েছে। তার সঙ্গে জমি বিরোধে অনেকের মামলা চলমান ছিল বা হুমকি দেয়ার বিষয়টি আমাদের নলেজে রয়েছে। সেগুলো তদন্ত করে দেখবো।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলের সিডিআরসহ অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে দেখেছি, বাসায় কিন্তু ওই সময় অন্য কেউ প্রবেশ করেনি।

আর আলমারি তছনছ করার বিষয়টি হচ্ছে, বাবুল যখন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে হাত ধুয়ে ড্রয়ারগুলো খোলা দেখেছে, সেখান থেকে সে কিছু টাকা নিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ওই টাকাগুলো সে দীর্ঘদিনের জমানো বাসা ভাড়া পরিশোধ করেছে।’ বুধবার সকালে সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় গলা কেটে খুন করা হয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও কাজের মেয়ে তাহমিনাকে। ঘটনার পর বিকালে পুলিশ এ ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের এক রংমিস্ত্রিকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাকালীন সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতি ছিল। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানায়, কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সূত্র ধরে সে ওই বাসায় যায়। এরপর একেক করে তিনজনকে ধারালো ছুরি দিয়ে খুন করে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনায় ছুরিও উদ্ধার করেছে। আলোচিত এ ঘটনার লোমহর্ষক দৃশ্য উঠে এসেছে ময়নাতদন্তে। নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী ও কাজের মেয়েকে।

এর মধ্যে কাজের মেয়ে তাহমিনার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রায় ১৬-১৭টি ছুরিকাঘাত ছিল তার দেহে। আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়ার শরীরেও ছিল আঘাতের পর আঘাত। এসব আঘাতে রক্তক্ষরণে তারা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের আমেরিকান প্রবাসী ছেলে আসিফ ইফতেখারের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। পিতা-মাতার মৃত্যু সংবাদ শুনে আসিফ ইফতেহার বৃহস্পতিবার বিকালেই সিলেট এসে পৌঁছান। সঙ্গে তার বোনরাও আসেন। গতকাল বিকালে সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে তাদের মরদেহ মানিকপীর (র.) গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন- রাষ্ট্রদূত ও সিনিয়র সচিব মুশফিকুল ফজল আনসারী, সিলেট নগর প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, নগর বিএনপি’র সভাপতি নাসিম হোসাইনসহ সর্বস্তরের মানুষ। জানাজার নামাজের পূর্বে বক্তৃতায় সিটি প্রশাসক বলেন, এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে কিনা সেটি পুলিশ খতিয়ে দেখবে। এ ছাড়া তিনি মামলার দ্রুত বিচার কামনা করেন।

এর আগে গতকাল বাদ জুমা বৃহত্তর মিতালী, টিবি গেট এলাকাবাসীর উদ্যোগে টিবি গেট এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তব্যে মওদুদুল হক মওদুদ বলেন, বাবুলের প্রেমের ঘটনায় এ ঘটনা ঘটতে পারে- সেটি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। সত্য উদ্‌ঘাটনে ভিন্নখাতে ডাইভার্ট করা হচ্ছে কিনা, তা দেখা দরকার। এলাকার মুরুব্বি আলিমুস সাদাত বলেন, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা- সে প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। ভালো করে বিষয়টি তদন্ত প্রয়োজন। তাঁতীদলের জেলার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বেলাল বলেন, এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবো। আরেকজনের উপস্থিতি: সিলেটের ওই বাসায় ঘটনার সময় আরও এক ব্যক্তির উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকার মানুষ। ২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা গেছে, খুনের ঘটনার সময় এক ব্যক্তি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। তবে আদৌও ওই ভিডিওটি ঘটনার সময়ের কিনা, তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ। নগর পুলিশের ডিসি (উত্তর) সাইফুল ইসলাম গতকালও বলেছেন, ঘটনার সময় ওই বাসায় বাবুল ছাড়া আর কারও উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মোবাইল ট্র্যাকিং করে তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।

ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল: ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল মিয়া। সেখানে গিয়ে মাদকসেবন করেন। তার বাসার কেয়ারটেকার রিয়াজ এ নিয়ে গণমাধ্যমকেও বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, বাবুলের কাছে টাকা পাবেন- এজন্য তাকে বার বার ফোন দেয়া হচ্ছে। প্রথমে জানায় শাহী ঈদগাহে যাবে। পরে বলে বাগানে। এরপর এসে টাকা দেয়। ওই সময় তার হাতের আঙ্গুলে ব্যান্ডেজ দেখেছেন বলে জানান তিনি।