আগস্টে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা

আগস্টে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা

ফন্ট সাইজ:

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারো খুলতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে অগ্রগতি হলেও এখনো মেলেনি মালয়েশিয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন। বাংলাদেশ থেকে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠানো হলেও মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের যাচাই বাছাই শেষে কোন কোন এজেন্সি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পাবে, তা এখনো স্পষ্ট করেনি। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চূড়ান্ত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব নয়। ফলে আগস্টের শেষ সপ্তাহে প্রথম ব্যাচের কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রথম ব্যাচের কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারে।

সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড- (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে প্রথম ব্যাচ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর মালয়েশিয়ার অনুমোদন পাওয়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
৪২৩ এজেন্সির তালিকা নিয়ে স্বচ্ছতা, পুরনো সিন্ডিকেটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা এবং কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমানো নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। দীর্ঘদিন পর শ্রমবাজারটি খুলতে গিয়ে সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ- মালয়েশিয়ার চূড়ান্ত ছাড়পত্র দ্রুত নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো।

গত ৩০শে জুলাই কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রথম ব্যাচ মালয়েশিয়ায় পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এরপর বাংলাদেশ ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা দিলেও মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত ছাড়পত্র আসেনি।

মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের দেয়া তালিকা যাচাই বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে নতুন করে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রমও শুরু করা যাচ্ছে না।

৪২৩ এজেন্সির তালিকা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মালয়েশিয়ার: মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে ১০টি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। এসব ক্রাইটেরিয়া পূরণকারী এজেন্সিগুলোর মধ্য থেকে মন্ত্রণালয় ৪২৩টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছে।

এজেন্সি মালিকদের একাংশ বলছেন, শুরুতে ১০টি ক্রাইটেরিয়া পূরণ করে আবেদন করতে বলা হলেও পরে তিন থেকে চারটি ক্রাইটেরিয়া শিথিল করা হয়। ১০টির মধ্যে সাতটি পূরণকারী ২৬০টি এবং ছয়টি পূরণকারী ১৬৩টি এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করে মোট ৪২৩টি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করা হয়।
তাদের অভিযোগ, ক্রাইটেরিয়া শিথিলের বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। একইসঙ্গে অন্যান্য বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে নতুন করে আবেদনের সুযোগও দেয়া হয়নি। এতে প্রায় দুই হাজার বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপি’র পাঁচ সংসদ সদস্য ও এক নেতার এজেন্সি বর্তমান মালয়েশিয়ার কাছে পাঠানো এজেন্সি তালিকায় রয়েছে। এসব এজেন্সির মধ্যে রয়েছে- মেটকো এন্টারপ্রাইজ, রূপসা ওভারসিজ, এয়ারওয়ে ইন্টারন্যাশনাল, আলম সন্স লিমিটেড, খন্দকার ওভারসিজ ও সুরমা ইন্টারন্যাশনাল।

বিএনপি’র পাঁচ সংসদ সদস্য ও নেতার এজেন্সির নাম থাকায় সিন্ডিকেটের অভিযোগ করেছেন এজেন্সি মালিকদের একাংশ। কিন্তু সিন্ডিকেটের এসব দাবি অস্বীকার করে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক মানবজমিনকে বলেন, আমার লাইসেন্স ২০০৯ সাল থেকে সাসপেন্ড ছিল। এ কারণে আমাকে কোনো পারমিশন দেয়া হয়নি। আমি হাইকোর্ট পর্যন্ত গিয়েছি, কিন্তু লাইসেন্সের অনুমতি দেয়া হয়নি। ২০২৬ সালে আমি এমপি হওয়ার পর লাইসেন্সটি ঠিক করেছি। এখন আমার লাইসেন্সের সংশোধন হয়েছে। আমি এখন লোক পাঠাতে পারবো। আপনারা একটু অপেক্ষা করেন, শেষ পর্যন্ত দেখেন আসলে কী হচ্ছে।

খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলি আসগার মানবজমিনকে বলেন, এগুলো সব মিথ্যা কথা। সরকার যেভাবে করবে, আমরা সেভাবেই চলবো।

মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)-এ বাংলাদেশ শ্রমিক-উৎস দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ সিস্টেমে বাংলাদেশকে বাদ দেয়া হয়নি। তবে এফডব্লিউসিএমএস-এ বাংলাদেশ থাকা আর নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর জন্য নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া- দু’টি আলাদা বিষয়।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এফডব্লিউসিএমএস-এর মাধ্যমে কোটা আবেদন ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা পাঠালেও ওই তালিকার চূড়ান্ত অনুমোদন মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের যাচাই বাছাইয়ের ওপর নির্ভর করছে।
এর কারণে ৪২৩টি এজেন্সিকে বাংলাদেশের দেয়া অনুমোদিত তালিকা হিসেবে দেখা গেলেও, এগুলোকে এখনই মালয়েশিয়ার চূড়ান্ত অনুমোদিত এজেন্সি বলা যাচ্ছে না।

প্রথম ব্যাচ যাবে বোয়েসেলের মাধ্যমে: সরকারের পক্ষ থেকে শুরুতেই কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এতে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমানো, প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম ব্যাচ বোয়েসেলের মাধ্যমে পাঠানো হলে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম পরবর্তী ধাপে শুরু হতে পারে। এর জন্য মালয়েশিয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় কোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া জরুরি।

৪৯ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল: এদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে অনিয়মের অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চার সাবেক সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন এজেন্সিসহ মোট ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার।

বাতিল হওয়া এজেন্সির মধ্যে রয়েছে- সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের স্ত্রী ও মেয়ের মালিকানাধীন অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল, ঢাকা-২০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল।

এ তালিকায় জনশক্তি খাতের ব্যবসায়ী নূর আলীর ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড এবং মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবে আলোচিত রুহুল আমিন ওরফে স্বপনের ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে।

বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান মানবজমিনকে বলেন, আমাদের সব সদস্যই যেন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটমুক্তভাবে ব্যবসা করতে পারেন। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সরকারও একই বিষয় চায় বলে আমরা জানি।

টিপু সুলতান বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সফর করেছেন এবং কূটনৈতিক পর্যায়েও আলোচনা চলছে। আমরা আশাবাদী, খুব শিগগিরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলবে। বাজারটি যেন সব সদস্যের জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং কোনো ধরনের সিন্ডিকেট যেন না হয়। এটাই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ও অনুরোধ।