কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে মাদক। হাত বাড়ালেই মিলছে সর্বত্র। ভারত সীমান্তঘেঁষা হওয়ার কারণে এ উপজেলায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই মাদক পৌঁছে যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে। আবার হোম ডেলিভারিতেও ভারত থেকে আসা এসব মাদক সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলে ঘরে বসেই মিলছে ট্যাপেন্টাডল, ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক। তবে এসব মাদকের চালানের কিছু অংশ সীমান্তরক্ষী বিজিবি’র অভিযানে উদ্ধার হলেও পুলিশের অভিযান ততটা দৃশ্যমান নয় বলে সচেতন মহলের দাবি। এর পাশাপাশি মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উপজেলা জুড়ে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের মতে, এখন আর মাদকসেবীদের নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয় না। একটি ফোন কলেই ‘হোম ডেলিভারি’ পদ্ধতিতে চাহিদা অনুযায়ী মাদক মাদকসেবী বা ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। আর এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে স্কুল- কলেজের ছাত্রসহ নানা বয়সী নারী-পুরুষ।
গোয়েন্দা সূত্রমতে, রমরমা অবৈধ মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী ও অসাধু ব্যক্তিরা জড়িত। এদের মধ্যে রয়েছে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু সদস্য। আছেন নামধারী ভূঁইফোড় সাংবাদিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিরাও।
বিজিবি ও পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রমতে, দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার সীমান্ত এবং উদয়নগর বিওপি-সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সীমান্তের একটি অংশ ভারত সীমানা ঘেঁষা হওয়ায় ওইসব এলাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উদয়নগর সীমান্তকে মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক পাচারকারী ও চোরাকারবারীরা।
আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ও পশ্চিম ধর্মদহ, প্রাগপুর ইউনিয়নের জামালপুর, মহিষকুণ্ডি মাঠপাড়া ও বিলগাথুয়া, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মুন্সীগঞ্জ, ঠোটারপাড়া, চরপাড়া, চল্লিশপাড়া, মরারচর ও ভাগজোত এবং চিলমারী ইউনিয়নের চরচিলমারীসহ সীমান্ত এলাকার পদ্মা নদীর বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে দেশে মাদক পাচার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। দৌলতপুরে প্রতি মাসে প্রায় ৫-৬ কোটি টাকার মাদকের কারবার হয়ে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট ওইসব সূত্র দাবি করেছেন।
বর্তমানে মাদক কারবারীদের প্রধান লক্ষ্য ১৭-৩৫ বছর বয়সী তরুণ ও যুবকরা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক কারবারী জানান, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের চাহিদা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। আকারে ছোট হওয়ায় এসব মাদক সহজে বহন করা যায়। প্রশাসনের নজর এড়াতে সরাসরি বেচাকেনার পরিবর্তে ফোনের মাধ্যমে ‘হোম ডেলিভারি’ সিস্টেমে বেচাকেনা করা হচ্ছে। ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাত্র ৫৫ পয়সায় সংগ্রহ করা এসব নেশাজাতীয় ট্যাবলেট বাংলাদেশে এনে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় বহিরাগত মোটরসাইকেল আরোহী ও অপরিচিত মানুষের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। বিশেষ করে বিকাল ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের মাদকসেবনের প্রবণতা বাড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের (৪৭ বিজিবি) এর তথ্যমতে, চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় অভিযানে প্রায় ১৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এছাড়াও গত এক সপ্তাহে সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার করেছে বিজিবি। অপরদিকে, দৌলতপুর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মাসে ১০৬টি মাদকের মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৭৭ জনকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ১৯শে জুলাই আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গড়ুরা এলাকা থেকে জব্দ হওয়া ৪০০ বোতল ফেনসিডিল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তেকালা পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই ফিরোজ হোসেনের বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন গণামাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে ঘটনাট তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন দৌলতপুর থানা পুলিশ। দৌলতপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম মহি বলেন, মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, তা অনেকেই জানেন। এখন প্রয়োজন কঠোর ও কার্যকর আইনি প্রয়োগ। মাদকের বিস্তার আগের তুলনায় বেড়েছে বলে স্বীকার করেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান। তিনি বলেন, এটি রোধে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন কমিটির সভায় কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের এমপি আলহাজ রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেছেন, মাদক কারবারী ও সন্ত্রাসীদের কোনভাবেই ছাড় দেয়া হবে না, সে যদি আমার দলের নেতাও হয়ে থাকে তাকে ছাড় দেওয়া হবেনা। মাদক নিয়ন্ত্রণে তিনি প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
