আমার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলো কেটেছে মফস্বল শহরের সীমাবদ্ধ আকাশের নিচে। সেখানেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল জীবনের প্রথম প্রশ্নগুলো। কলেজে পড়ার সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য হই; এখানে পাঠচক্রের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সান্নিধ্য সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার পথ দেখায়। নান্দনিক বই আর সামাজিক কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে শেখায়, সমাজকে বদলাতে হলে আগে নিজেকে বদলাতে হয়।
তখনই উপলব্ধি করি-গ্রাম ও মফস্বলে পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ আসলে দারিদ্র্য নয়, জ্ঞানের অভাব; আলোর সংকট। এই অন্ধকারে বন্দি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর মূল্যবোধের দায়ও বহন করি আমরা নিজেরাই-নগরের সেই শিক্ষিত মানুষ, যারা শেকড়ের আলো নিয়ে শহরে এলেও ধীরে ধীরে সেই আলো নিভিয়ে ফেলি। রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে আমাদের আলোচনায় প্রায়ই অবকাঠামো, বিনিয়োগ, জিডিপি বা বড় শহরের ঝলমলে সাফল্যের গল্প উঠে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-রাষ্ট্রের শিরা-উপশিরায় যে প্রাণস্রোত, তার বড় অংশ গ্রাম ও জেলা শহরকেন্দ্রিক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তা ও সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। সেই জায়গায় যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন জরুরি হয়ে ওঠে: শহরে বসবাসরত শিক্ষিত নাগরিকরা কি তাদের নিজ নিজ জেলায় ফিরে গিয়ে সাধারণ মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, পরিবেশ ও মানবিক মূল্যবোধ বিষয়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে পারেন না? পারলে, সেটিই হতে পারে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের টেকসই পথ।
বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বড় অংশই জীবিকার তাগিদে রাজধানী বা বড় শহরমুখী। সেখানে তারা পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে পরিচিত হয়, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা পায়। কিন্তু এই অর্জনের সুফল কতোটা গ্রাম ও মফস্বলে পৌঁছায়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পৌঁছায় না। ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে জ্ঞানের, সচেতনতার ও সুযোগের একটি স্থায়ী ব্যবধান তৈরি হয়। এই ব্যবধান কমাতে হলে শহরের শিক্ষিত নাগরিকদের নিজেদের শেকড়ে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবেÑহয়তো স্থায়ীভাবে নয়, কিন্তু নিয়মিত ও সংগঠিতভাবে। শিক্ষার কথাই ধরা যাক। গ্রামে এখনো অনেক পরিবার মনে করে, পড়াশোনা মানে কেবল চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি; জীবনের মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ বা নাগরিক সচেতনতার সঙ্গে এর সম্পর্ক তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। শহরে শিক্ষিত কেউ যদি নিজের জেলায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, অভিভাবকদের বোঝান-শিক্ষা কেবল পরীক্ষার নম্বর নয়, বরং চিন্তার স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার ভিত্তি-তাহলে সেই সমাজে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের বীজ রোপিত হবে। কোচিং বা টিউশন নয়, প্রয়োজন প্রেরণা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
স্বাস্থ্য খাতেও একই বাস্তবতা। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব-এসব বিষয়ে গ্রামে এখনো নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণা প্রচলিত। শহরে বসবাসরত ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন শিক্ষিত নাগরিকরা যদি নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে স্বাস্থ্যশিবির, সচেতনতামূলক আলোচনা বা সহজ ভাষায় পরামর্শ দেন, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য সচেতনতা-পরিষ্কার পানি ব্যবহার, সময়মতো টিকা, মানসিক চাপকে গুরুত্ব দেয়া-জীবন বাঁচাতে পারে। রাজনীতির প্রশ্নে আমাদের সমাজ আরও জটিল। রাজনীতি শব্দটি শুনলেই গ্রামে অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ক্ষমতার দাপট, সহিংসতা বা সুবিধাবাদ। নাগরিক অধিকার, ভোটের গুরুত্ব, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ভূমিকাÑএসব বিষয়ে সুস্থ আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত।
শহরের শিক্ষিত নাগরিকরা যদি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিক রাজনীতির কথা বলেন, মানুষকে বোঝান যে, রাজনীতি মানে কেবল নেতাদের বিষয় নয়, বরং নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত-তাহলে গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হবে। সচেতন নাগরিক ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত গ্রামবাংলায় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হলেও সচেতনতা সেখানে সবচেয়ে কম। নদী ভাঙন, খরা, বন্যা বা দূষণের প্রভাব নিয়ে শহরে আলোচনা হয়, সেমিনার হয়; কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কাছে কার্যকর তথ্য ও করণীয় পৌঁছায় না। শহরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা শিক্ষিত তরুণরা যদি নিজ এলাকায় গিয়ে স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে বৈশ্বিক বাস্তবতার যোগসূত্র ব্যাখ্যা করেন, পরিবেশবান্ধব চর্চা শেখানÑতাহলে প্রতিরোধ ও অভিযোজনের সক্ষমতা বাড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবিক ও মানসিক কাজ। সহানুভূতি, সহনশীলতা, লিঙ্গসমতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি-এসব মূল্যবোধ সমাজে স্বতঃসিদ্ধ নয়; এগুলো চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
শহরের শিক্ষিত নাগরিকরা যদি নিজ নিজ জেলায় গিয়ে তরুণদের সঙ্গে বসে কথা বলেন, ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি শেখান, সহিংসতার বিকল্প হিসেবে সংলাপের পথ দেখান-তাহলে সমাজে উগ্রতা ও বিভাজন কমবে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অর্থনীতির সূচকে নয়, সামাজিক সুস্থতায়ও পরিমাপিত হয়। অবশ্য এই কাজ সহজ নয়। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন-সব মিলিয়ে অনেকেই পিছিয়ে থাকেন। কিন্তু উদ্যোগ যদি ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, বরং সংগঠিতভাবে নেয়া যায়-বন্ধুসমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে-তাহলে তা বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে। প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়ক ভূমিকা এবং সর্বোপরি নাগরিকদের মানসিক প্রস্তুতি। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্বের। আমরা যারা শহরে বসে সুবিধা ভোগ করি, তারা কি আমাদের শেকড়ের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ নই? রাষ্ট্র তো কেবল রাজধানী নয়; রাষ্ট্র মানে প্রতিটি জেলা, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি মানুষ। শহরে বসবাসরত শিক্ষিত নাগরিকরা যদি নিজ নিজ জেলায় গিয়ে সাধারণ মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, পরিবেশ ও মানবিক বিষয়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করেন-তবেই রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। উন্নয়ন তখন আর দূরের স্বপ্ন থাকবে না; তা হয়ে উঠবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর এজন্য এগিয়ে আসতে হবে নগরে বসবাসরত নাগরিকদের। নাগরিক ঐক্যের শক্তিতেই বদলে যেতে পারে গ্রাম-বাংলার মুখ-আর সেখান থেকেই শুরু হবে সত্যিকারের রাষ্ট্র উন্নয়নের পথচলা।
লেখক: সদস্য, আলোর ইশকুল, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
