মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে জয় পাওয়ার পর তাকে লক্ষ্য করে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের পরিমাণ প্রায় ২০ গুণ বেড়েছে। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট-এর গবেষণার ফলাফল আনাদোলুর সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ১লা জুন থেকে ৩রা আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে আল-সাইয়েদের নামের সঙ্গে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যযুক্ত ১৫৫টি পোস্ট প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ৪ঠা থেকে ১০ই আগস্টের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ৯৯৯টিতে। অর্থাৎ ১ হাজার ৮৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
এ নিয়ে বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানায়, গবেষণায় ১লা জানুয়ারি থেকে আল-সাইয়েদকে লক্ষ্য করে শনাক্ত করা মোট ৩৮ হাজার ২৮০টি ইসলামবিদ্বেষী পোস্টের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই ওই সাত দিনে প্রকাশিত হয়। ৫ই আগস্ট একদিনে ৬ হাজার ৯২৩টি পোস্ট প্রকাশের মধ্য দিয়ে এর পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এদিকে একই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ১লা জুন থেকে ১০ই আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য প্রচারকারী মোট ৪ লাখ ৯ হাজার ৬৪০টি পোস্ট শনাক্ত করেছে। চলতি গ্রীষ্মে একদিনে সবচেয়ে বেশি মুসলিমবিদ্বেষী পোস্টও দেখা যায় ৫ আগস্ট। এর সংখ্যা মোট ১১ হাজার ৮৮৩।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই উত্থানের সবচেয়ে বড় একটি প্রবণতা ছিল আল-সাইয়েদকে ‘ইসলামি জিহাদি’ হিসেবে আখ্যা দেয়া এবং মিথ্যাভাবে তাকে হামাস, হিজবুল্লাহ ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করা। কিছু পোস্টে দাবি করা হয়, আল-সাইয়েদ ক্ষমতায় গেলে ‘ইসলামি আইন’ চাপিয়ে দেবেন। আবার মুসলিম সংগঠনগুলোর নির্বাচনী অনুদানকে ‘সন্ত্রাসী অর্থায়ন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কোনো কোনো পোস্টে ‘ইসলামপন্থী ও কমিউনিস্ট’ শক্তি ডেমোক্রেটিক পার্টির নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে- এমন ষড়যন্ত্রতত্ত্বও ছড়ানো হয়। কিছু পোস্টে ২০০১ সালের সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ তুলে আল-সাইয়েদকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের একজন ব্যক্তি এবং দেশটির প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যরা ‘রি-মাইগ্রেশন’-এর ডাক দেয়। যার অর্থ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে মুসলিমদের ব্যাপকভাবে সরিয়ে দেয়া।
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট বলেছে, এই প্রবণতা গত বছর নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির সফল প্রচারণার সময় নথিবদ্ধ করা বক্তব্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, একজন মুসলিম প্রার্থী যখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন অথবা নির্বাচনে জয়ী হন, তখন একই ধরনের মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণার একটি স্থিতিশীল ভাণ্ডার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রগতিশীল সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আল-সাইয়েদ গত সপ্তাহে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেনসকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেন। এই জয় আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা এআইপ্যাক-এর জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্টিভেনসকে সমর্থন করতে এআইপ্যাক ৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করে। নভেম্বরে আল-সাইয়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন। অবসর নিতে যাওয়া সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেয়া আসনটির জন্য এই নির্বাচন হবে। ডেমোক্রেটরা সিনেটে আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার আশা করছে এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সে প্রচেষ্টার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারণার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সবার জন্য মেডিকেয়ার চালু করা এবং রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো। একই সঙ্গে তিনি ইসরাইল ও অন্যান্য দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি সিএনএনকে তিনি বলেন, আমি রাজনীতি থেকে অর্থ বের করে আনতে চাই, মানুষের পকেটে অর্থ দিতে চাই এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার চালু করতে চাই।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাকে নিয়ে করা আক্রমণকে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল হিসেবেও বর্ণনা করেন তিনি। আল-সাইয়েদকে ‘পুরোপুরি বাজে লোক’, ‘উগ্র বামপন্থী সমাজতন্ত্রী’ এবং ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। আরও দাবি করেছেন, আল-সাইয়েদ ‘ইহুদি ও ইসরাইলকে ঘৃণা করেন’।
করপোরেট একচেটিয়া আধিপত্যের সমালোচনা করে গত মাসে এক বিতর্কে আল-সাইয়েদ বলেন, আমি সমাজতন্ত্রী নই। আমি শুধু এমন একজন পুঁজিবাদী, যে পুঁজিবাদ কীভাবে কাজ করে তা বোঝে। গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ব্যঙ্গ করে আল-সাইয়েদকে ‘প্রেসিডেন্ট আবদুল আল-সাইয়েদ’ বলে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন সংবাদ অনুষ্ঠান ‘ডেমোক্রেসি নাউ!’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-সাইয়েদকে প্রশ্ন করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়া তার জন্য কী অর্থ বহন করবে। জবাবে তিনি বলেন, আমি কোনো কিছুর প্রথম হওয়ার বিষয়টি খুব বেশি ভাবি না। আমি শুধু আমার অঙ্গরাজ্যের জন্য সত্যিই একজন ভালো সিনেটর হতে চাই। তিনি আরও বলেন, তবে আমাদের দেশটি আসলে কেমন- তা নিয়ে আমি ভাবি। ডনাল্ড ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স ও মাইক রজার্সের মতো মানুষ আছেন, যারা আমেরিকাকে তার প্রকৃত অবস্থার চেয়ে ছোট করে সংজ্ঞায়িত করতে চান। আমি জানি আমেরিকা অনেক বড়। এটি উদারমনা, উন্মুক্ত হৃদয়ের এবং চিন্তাশীল।
