দখলকৃত পশ্চিম তীরে দখলদারদের চালানো ‘ইহুদি সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলি তিন শতাধিক রিজার্ভ সেনা। ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সহিংসতা ইসরাইলি সেনাদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে বলে সতর্ক করেছেন তারা। বুধবার ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, রিজার্ভ সেনারা ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রিজার্ভ সেনাদের চিঠি’ শিরোনামে একটি আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিটি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ আইয়াল জামিরের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদোলু।
এমন সময় ইসরাইলি রিজার্ভ সেনাদের এই আবেদন করা হলো, যখন চরমপন্থী দখলদাররা নাবলুসের দক্ষিণে ফিলিস্তিনি শহর কুসরার কাছে জড়ো হতে থাকে। সেখানে তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবার জানিয়েছে, তারা কার্যত নিজেদের বাড়ির ভেতর অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেনারা অভিযোগ করেছেন, দখলদারদের হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও সরঞ্জাম সেনাদের দেয়া হচ্ছে না। সেনাবাহিনী যেসব ঘটনাকে ‘সংঘর্ষ বা উত্তেজনার ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে, সেগুলোতে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের আলাদা করতে সেনাদের বারবার মোতায়েন করা হচ্ছে। কিন্তু সহিংসতা শুরু হওয়ার আগেই তা ঠেকানোর জন্য সেনাদের হাতে স্পষ্ট ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে না।
আবেদনে বলা হয়েছে, আমরা এমন রিজার্ভ সেনা, যারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে শত শত দিন দায়িত্ব পালন করেছি। পশ্চিম তীরেও আমরা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছি। কিন্তু আমরা মনে করছি, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব মাঠে আমাদের পরিত্যাগ করেছে এবং আমাদের সমর্থন করছে না। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আমাদের বারবার আগুন নেভাতে বলা হচ্ছে। কিন্তু যারা জাতীয় সন্ত্রাসবাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের থামানো ও নির্মূল করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার কেউ নেই।
এখানে ‘জাতীয় সন্ত্রাসবাদ’ বলতে দখলদারদের সহিংসতার কথা বোঝানো হয়েছে। রিজার্ভ সেনারা সতর্ক করে বলেছে, সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে হামলায় জড়িত কিছু দখলদারের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন যুক্ত হয়ে সেনাদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের দাবি, স্পষ্ট নির্দেশের অভাব এবং ‘ইহুদি সন্ত্রাস’ সহ্য করার প্রবণতার কারণে উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ঘটনায় ইসরাইলি সেনারা আহত ও নিহত হয়েছে। আইয়াল জামিরের প্রতি তাদের আহ্বান, ‘ইহুদি সন্ত্রাস বন্ধ ও নির্মূল করতে দৃঢ় পদক্ষেপ’ নিতে হবে এবং তা প্রতিরোধের জন্য সেনাদের স্পষ্ট ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিতে হবে।
আবেদনকারীদের একজন মেজর (অব.) আভিয়াদ হোমেনির-রোজেনব্লুম সংবাদপত্রটিকে বলেছেন, দখলদারদের সহিংসতা ও ইচ্ছাকৃত সংঘাত ক্রমেই বাড়তে থাকায় সেনাদের বারবার নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ব্যর্থতার কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ‘ইহুদি সন্ত্রাসের মূলে আঘাত করতে না পারা এবং সেনাদের, বিশেষ করে স্থানীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের, এ ধরনের বিপজ্জনক ঘটনায় জড়িয়ে পড়া’ ইসরাইলের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে। ক্যাপ্টেন (অব.) টম বেন-হাসি বলেন, কুসরায় যা ঘটছে, ‘তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পশ্চিম তীরে চলমান একটি বৃহত্তর ধারার অংশ।’ তিনি বলেন, সশস্ত্র দখলদার গোষ্ঠীগুলো ‘খুব কম বাধার মুখে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীকে প্রায়ই আইনের প্রয়োগের পরিবর্তে একটি উগ্র সংখ্যালঘুর কর্মকাণ্ড রক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক সহিংসতা নিরাপত্তা বাড়ায় না। এটি সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলে, অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ায় এবং সবার নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী এই আবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে বুধবার বিরোধী দলের নেসেট সদস্য গিলাদ কারিভ কুসরায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে ‘দখলদার গোষ্ঠীর সন্ত্রাসে’ চোখ বন্ধ করে থাকার জন্য ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করেছেন। সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের বাড়ির কাছে স্থাপন করা একটি অবৈধ দখলদার চৌকি তারা সরিয়ে দিয়েছে। তবে পরে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ইসরাইলি সেনারা চলে যাওয়ার পরও দখলদাররা সেখানে অবস্থান করছে। বিরোধী ডেমোক্রেটস পার্টির সদস্য কারিভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা সরে গেছে। কিন্তু দখলদাররা এখনও বাড়িটি ঘিরে রেখেছে। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনীর কাজে বাধা দেয়া এবং নির্দেশ লঙ্ঘনের স্পষ্ট চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো উগ্র দখলদারকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
কারিভ বলেন, সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফকে বুঝতে হবে যে অবৈধ চৌকি সরানোর অভিযান থেকে সরে আসা এবং অবরোধ তুলে নিতে ব্যর্থ হওয়া দখলকৃত ভূখণ্ডে জাতীয় সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করছে। সেনাবাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এই গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডে আর চোখ বন্ধ করে থাকা যথেষ্ট হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিন। তিনি আরও বলেন, আমরা এবং আমাদের ছেলে ও নাতিরা নিয়মিত বা রিজার্ভ সেনাবাহিনীতে এই জন্য দায়িত্ব পালন করি না যে, আইন অমান্যকারী ইসরাইলিরা আমাদের দিকে পাথর ও লাঠি ছুড়বে। কারিভ আরও একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন, যেখানে দখলদারদের অবৈধ চৌকির দিকে যাওয়া রাস্তায় পাথর রেখে সেনাবাহিনীর সেখানে পৌঁছানোর পথ বন্ধ করতে দেখা যায়। অন্য এক পোস্টে তিনি বলেন, এখানে কোনো আইন নেই এবং আইন প্রয়োগ করার মতোও কেউ নেই। ফিলিস্তিনি তরুণরা যদি একই কাজ করত, তাহলে কী ঘটত, তা কেবল কল্পনা করা যায়।
টানা তৃতীয় দিনের মতো কুসরায় তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবার নিজেদের বাড়ির ভেতরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ আবদেল-সালাম। ফিলিস্তিনি এই বাসিন্দা আনাদোলুকে বলেছেন, বুধবার প্রায় ২০০ দখলদার বাড়িগুলোর চারপাশে জড়ো হয় এবং পাথর দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এতে হামলা কিংবা বাড়িতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, তার চার সদস্যের পরিবারসহ তার ভাই, বাবা-মা এবং আরেক আত্মীয়ের পরিবার তিন দিন ধরে বাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। তাদের কাছে খাবারসহ প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আবদেল-সালাম জানান, দখলদাররা বাড়িগুলোর দিকে যাওয়া রাস্তায় তাবু স্থাপন করেছে। ফলে পরিবারগুলো কুসরার বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারছে না।
তিনি বলেন, রাতের বেলায় ইসরাইলি বাহিনী একটি তাবু সরিয়ে দিয়েছিল। এরপর প্রায় ২০০ দখলদার এসে পাথর দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। আবদেল-সালাম বলেন, দখলদাররা আমাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। এর আগে বুধবার ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান আভি ব্লুথের নেতৃত্বে সেনা কর্মকর্তারা কুসরা ও আশপাশের আবাসিক এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন।
