সাভারে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উপজেলার পৃথক দু’টি স্থান- শ্যামপুর ও সাদাপুর গোপের বাড়ি এলাকা থেকে বোমা ও প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধারের পর পুরো এলাকা জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকার আব্দুল জলিলের বাড়ি থেকে বিস্ফোরক ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। তবে বাড়িটি ঘিরে রাখার আগেই মঙ্গলবার হেমায়েতপুর এলাকা থেকে আরিফ হোসেন (২৮) নামে এক ব্যক্তিকে ৫টি হাতবোমাসহ আটক করে পুলিশ। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ ঘটনায় সিটিটিসি’র একজন এসআই বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় বুধবার বিকালে মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম।
এদিকে, বুধবার সকালে পার্শ্ববর্তী বনগাঁও ইউনিয়নের গোপেরবাড়ী এলাকার ঘোড়া মসজিদের সামনে মাঠ থেকে প্রেসার কুকারে তৈরি একটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে পুলিশ। বিকালে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করেন বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় আব্দুল জলিলের মালিকানাধীন তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। সেই অভিযান শেষ হয় রাত পৌনে ২টায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি) ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের সদস্যরা যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করেন। সাভার থানা পুলিশের সদস্যরাও তাদের সহযোগিতা করেন। বাসাটির মালিক আব্দুল জলিল পক্ষঘাতগ্রস্ত ও শয্যাশায়ী। তার মেয়েরা বাসাটির দেখাশোনা করেন। তার বড় মেয়ে বলেন, গত ৫ই আগস্ট আব্বাস আলী নামের এক ব্যক্তি মাসে চার হাজার টাকায় নিচতলা ফ্ল্যাটের একটি ঘর ভাড়া নেন। বাসায় ওঠার সময় বলেছিলেন তিনি একজন প্রাইভেটকার চালক। পাশেই শ্যামপুর প্রাইমারি স্কুল হওয়ায় সেখানে বাচ্চাদের ভর্তি করাবেন, সেজন্য বাসাটি পছন্দ তার। এক হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। এরপর তাকে আর দিনের বেলায় দেখা যায়নি। ওই ঘর থেকে যেসব জিনিসপত্র পুলিশ উদ্ধার করেছে, সেগুলো তিনি রাতের বেলায় কোনো এক ফাঁকে নিয়ে এসেছিলেন। মাঝে মাঝে রাতের বেলায় নিচতলা থেকে জিনিসপত্র জোরে জোরে রাখার শব্দ পাওয়া যেত বলে বাড়িওয়ালার মেয়ে বলেন।
পুলিশের ভাষ্যমতে, আটক আরিফ হোসেন ‘নব্য জেএমবি’ সদস্য। তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কিশোরগঞ্জ থেকে অনুসরণ করছিল। পরে আরিফ সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় বাস থেকে নামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে আটক করে। এ সময় তার কাছে তল্লাশি করে ৫টি হাতবোমা, একটি ব্যাগ, চাকু ও লাইটার উদ্ধার করা হয়। আরিফের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্যামপুরে আব্দুল জলিলের মালিকানাধীন বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় ওই বাড়ি থেকে ৯টি ককটেলসদৃশ বস্তু এবং বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির উপকরণ, গান পাউডার ও বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, বোমা উদ্ধারসহ অভিযান পরিচালনা করেছেন সিটিটিসি’র সোয়াত ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযানে বাড়ি থেকে জেএমবি’র কিছু লিফলেট, কয়েকটি ককটেলসদৃশ বস্তু এবং বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির উপকরণ, গান পাউডার ও বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
অপরদিকে সাভার মডেল থানার ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই মো. ইমরান বলেন, মঙ্গলবার রাতে বনগাঁও ইউনিয়নের গোপেরবাড়ী এলাকার ঘোড়া মসজিদের সামনের মাঠে নীল রঙের প্লাস্টিকের একটি ড্রাম দেখতে পায় স্থানীয়রা। ড্রামের ভেতর কিছু কাপড়, একটি কোরআন শরীফ, স্কচটেপ প্যাঁচানো একটি প্রেসার কুকার ছিল। রাতে ড্রামটি ওই অবস্থায় ছিল। তিনি বলেন, প্রেসার কুকারের মুখ থেকে স্কচটেপ প্যাঁচানো কিছু বৈদ্যুতিক তার বের হয়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়।
প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে আইইডি (বোমাসদৃশ) মনে হচ্ছে। ঝুঁকিমুক্তভাবে এটি নিষ্ক্রিয় করার জন্য ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ‘বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট’-কে খবর দেয়া হয়েছে। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে প্রেসার কুকার বোমাটি নিষ্ক্রিয় করেন বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা।
উল্লেখ্য, গত ৩০শে জুলাই আশুলিয়ার চারাবাগ খেজুর বাগান এলাকায় একটি চায়ের দোকানের সামনে ব্যাগ থেকে প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
