তরুণদের তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ: আইনের সুরক্ষা শক্তিশালী করা জরুরি

আন্তর্জাতিক যুব দিবস

তরুণদের তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ: আইনের সুরক্ষা শক্তিশালী করা জরুরি

ফন্ট সাইজ:

একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার বড় একটি সূচক হলো সেই দেশের তরুণ প্রজন্ম কতটা সুস্থ, সক্ষম ও আসক্তিমুক্ত। কিন্তু আমাদের তরুণদের সামনে এমন একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে, যার প্রভাব শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জন্যও উদ্বেগজনক। সেই ঝুঁকিটি হলো তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি।

প্রতিবছর আন্তর্জাতিক যুব দিবসে তরুণদের অধিকার, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। অথচ সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের বয়সেই যদি একজন তরুণ নিকোটিনে আসক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মজীবন এবং উৎপাদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। তাই তরুণদের তামাকমুক্ত রাখা জনস্বাস্থ্যের কোনো ঐচ্ছিক কর্মসূচি নয়, বরং বাধ্যতামূলক কর্তব্য।

তরুণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের বাস্তবতা বেশ উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রায় ১০ শতাংশ ইতোমধ্যে তামাক ব্যবহার করে। আবার গ্লোবাল ইয়ূথ টোব্যাকো সার্ভে (এণঞঝ)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের উপস্থিতি ৬.৯ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৈশোরেই তামাকের সংস্পর্শে আসছে।

এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি থেকে যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারছি? সম্প্রতি পাস হওয়া ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধন ২০২৬)-এর কয়েকটি বিধান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

প্রথমত, ১৮ বছরের নিচে কারও কাছে বা কারও দ্বারা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তরুণ বয়সে তামাক ব্যবহারের সূচনা ঠেকাতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। কারণ এই বয়সে নিকোটিনের সংস্পর্শ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকের সহজলভ্যতা কমানো তাদের পরবর্তী জীবনে দীর্ঘমেয়াদি আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশু পার্কের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তরুণদের দৈনন্দিন চলাচল ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত স্থানগুলোকে তামাক বিক্রির আওতামুক্ত রাখার এই উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেটের কাছেই যদি সহজে সিগারেট বা অন্য তামাকজাত পণ্য পাওয়া যায়, তাহলে শুধু একজন শিক্ষার্থীর কেনার সুযোগই তৈরি হয় না; বরং তার কাছে তামাকের উপস্থিতি ও প্রাপ্যতাও স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। ফলে ১০০ মিটারের এই বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তরুণদের তামাকের সংস্পর্শ ও সহজপ্রাপ্যতা দুটোই কমানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, বিক্রয়স্থল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রেক্ষাগৃহ ও চলচ্চিত্রে যেকোনো উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তরুণদের সুরক্ষায় এই বিধানটির গুরুত্ব অত্যাধিক। কারণ তামাকের ব্যবহার শুধু পণ্যের সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করে না; পণ্যটিকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও তরুণদের আচরণ ও মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডিং ও বিনোদনমূলক কনটেন্টের মাধ্যমে তামাককে আকর্ষণীয়, আধুনিক বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ বন্ধ করা তাই অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এই নিষেধাজ্ঞা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তরুণদের বড় একটি অংশ যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মিত যুক্ত। সেখানে তামাকজাত পণ্যের সরাসরি বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি পরোক্ষ প্রচারণা ও আকর্ষণীয় কনটেন্টের মাধ্যমে পণ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি করার ঝুঁকিও রয়েছে।

তবে নতুন আইনের এই প্রশংসনীয় দিকগুলোর পাশাপাশি তরুণদের সুরক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ অপ্রাপ্তিও রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো খুচরা শলাকা সিগারেটসহ তামাকজাত দ্রব্যের খুচরা বিক্রি নিষিদ্ধ না করা। তামাকবিরোধী সংগঠন ও জোটগুলোর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে দাবি জানানো হয়ে আসছিল। কারণ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও অল্পবয়সী তরুণদের জন্য পুরো একটি প্যাকেট সিগারেট কেনার তুলনায় একটি বা দুটি শলাকা কেনা অনেক সহজ এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল।

খুচরা বিক্রি বন্ধ করা গেলে তামাকজাত পণ্য কেনার ক্ষেত্রে তরুণদের সামনে একটি অতিরিক্ত আর্থিক বাধা তৈরি হতো। ফলে ১৮ বছরের নিচে বিক্রি নিষিদ্ধ করার বিধানের পাশাপাশি একক শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলে তরুণদের তামাকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ আরও কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব হতো।

তরুণদের সুরক্ষায় আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের তামাক ও নিকোটিন পণ্যের বিস্তার। ই-সিগারেট, ভেপিং পণ্য এবং নিকোটিন পাউচ এখন বিশ্বজুড়ে তরুণদের কাছে নিকোটিন পৌঁছানোর নতুন পথ তৈরি করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ১৩-১৫ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কিশোর ই-সিগারেট ব্যবহার করে। যেসব দেশে তুলনামূলক তথ্য পাওয়া যায়, সেখানে কিশোরদের ভেপিংয়ের সম্ভাবনা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় গড়ে প্রায় নয় গুণ বেশি। অর্থাৎ ই-সিগারেট ও ভেপিংকে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের বিকল্প নিকোটিন পণ্য হিসেবে দেখলে বাস্তব ঝুঁকির একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে।

নিকোটিন পাউচ নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে নিকোটিন পণ্যের বাজারে নিকোটিন পাউচের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে এবং এসব পণ্য তরুণদের আকৃষ্ট করতে ফ্লেভার, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা ব্যবহার করছে।

নিকোটিন বিশেষ করে শিশু, কিশোর ও তরুণদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তরুণ বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ চলতে থাকায় নিকোটিনের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি বেশি। তামাক ব্যবহার শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের রোগসহ নানা গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে নতুন ধরনের নিকোটিন পণ্যকে প্রচলিত তামাকজাত পণ্যের বাইরে রেখে তামাক নিয়ন্ত্রণের পথে হাটলে তরুণদের সুরক্ষায় একটি বড় ঘাটতি থেকে যাবে। প্রচলিত তামাকজাত দ্রব্যের বাইরে নতুন পণ্যের জন্য আইনে দুর্বলতা তৈরি হলে তা তরুণদের জন্য নিকোটিন আসক্তির নতুন প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক যুব দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—তরুণদের জন্য তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। এ বছর আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্য—‘ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা’। তরুণদের জীবনযাপন, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি নিরাপদ, সুস্থ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা সবারই অভিন্ন। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো তরুণের কাছে তামাক বা নিকোটিন পণ্য সহজলভ্য, আকর্ষণীয় কিংবা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে না পারে।

গত ৩১ মে ২০২৬ তারিখে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রদত্ত বাণীতে ‘তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশু-কিশোর ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সরকার বদ্ধপরিকর’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাই তামাকমুক্ত তরুণ প্রজন্ম কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের সুস্থ, উৎপাদনশীল ও টেকসই ভবিষ্যতের অপরিহার্য শর্ত।

লেখক: ইয়ূথ এডভোকেট এগেইনস্ট টোব্যাকো ও শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট।