‘মক্কা জোটে’ মিসরকে চায় না সৌদি, নেপথ্যে কী?

‘মক্কা জোটে’ মিসরকে চায় না সৌদি, নেপথ্যে কী?

ফন্ট সাইজ:

তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে গত সপ্তাহে সৌদি আরব মক্কা জোট নামে যে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে, তাতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে রিয়াদ।
তুরস্কের পক্ষ থেকে মিসরকে চুক্তিতে যুক্ত করার জোরালো আগ্রহ থাকলেও সৌদি আরব তা সমর্থন করেনি বলে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট তিন সৌদি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো জানায়, সৌদি আরবের অবস্থান হলো- ‘অন্তত আপাতত’ মিসরকে এই নিরাপত্তা চুক্তিতে যুক্ত করা উচিত নয়।

তাদের মতে, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি রিয়াদের হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, অতীতে মিসর যে কৌশলগত ও সামরিক গুরুত্ব বহন করত, এখন আর তা নেই।
গত শুক্রবার পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সৌদি কর্মকর্তারা বলেছেন, এই চুক্তির লক্ষ্য হলো তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করা। তবে সংকটের সময় কীভাবে সামরিক সহায়তা দেয়া হবে, কোন পরিস্থিতিতে চুক্তি কার্যকর হবে এবং যৌথ সামরিক পদক্ষেপ কীভাবে পরিচালিত হবে- এসব বিষয়ে চুক্তিতে বিস্তারিত স্পষ্টতা নেই।

সিসি সরকারের ওপর রিয়াদের ক্ষোভ
সৌদি সূত্রগুলোর দাবি, মিসরকে চুক্তির বাইরে রাখার অন্যতম কারণ রিয়াদ ও কায়রোর মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা উত্তেজনা। তারা বলেন, ২০১৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিসি ক্ষমতা দখলের পর সৌদি আরব তার সরকারের সবচেয়ে বড় আর্থিক সমর্থকদের একজন ছিল। মিসরের দুর্বল অর্থনীতিকে সামাল দিতে রিয়াদ প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে মিসরের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় সৌদি নেতৃত্ব এখন হতাশ।
এক সৌদি সূত্র বিশেষ করে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের দীর্ঘ যুদ্ধে মিসরের ‘সীমিত ও অনির্ভরযোগ্য’ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। একইভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের সময় মিসরের অবস্থান নিয়েও রিয়াদের অসন্তোষ রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মিসরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও সৌদি আরব উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আবুধাবির সমর্থন নিয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সৌদি সূত্রগুলোর মতে, এসব গোষ্ঠী সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

দুই সূত্রের দাবি, ইরানের হামলার জবাবে মিসর আবুধাবিতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। যুদ্ধের সময় সিসি একাধিকবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন। কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এতে রিয়াদে সিসির আবুধাবিমুখী অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সৌদি সূত্রগুলো আরও বলেছে, সোমালিল্যান্ডে আমিরাতের কর্মকাণ্ড, ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির কৌশলগত সম্পর্ক, নীল নদের গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম নিয়ে বিরোধে ইথিওপিয়ার প্রতি আমিরাতের সমর্থন এবং সুদানের র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) প্রতি আবুধাবির সমর্থন- এসব নীতিকে মিসরের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের বিরোধী বলে মনে করে রিয়াদ।
এক সূত্রের ভাষায়, আবুধাবির সঙ্গে কায়রোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সৌদি আরবের কাছে মিসরকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কতটা নির্ভরযোগ্য, সে বিষয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

সৌদি রাজপরিবারের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, সিসির আমলে সৌদি আরব মিসরকে আর নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে না। বরং দেশটিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই মিসর সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল; কিন্তু বিনিময়ে খুব বেশি কিছু দেয়নি।
তার ভাষায়, ‘মিসর সবসময় আমাদের ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তারা দেয় না, শুধু নেয়- বারবার নেয়, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দেয় না।’
তবে মিসরকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তুরস্কের আগ্রহ ছিল বলে জানিয়েছে তুর্কি সূত্রগুলো। শনিবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসরকে তুরস্কের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কারিগরি বিষয়গুলো সমাধান হলে ভবিষ্যতে কায়রোর এই জোটে যোগ দেয়ার কোনো কারণ নেই- এমনটি বলা যায় না।
পরবর্তী সময়ে তুরস্কের কয়েকটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানায়, মিসরকে চুক্তিতে যুক্ত করার জন্য আঙ্কারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবেও কায়রোকে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল।
তবে তুর্কি সূত্রগুলোর দাবি, শেষ পর্যন্ত মিসর যোগ দিতে প্রস্তুত নয়- এটি স্পষ্ট হওয়ার পর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মিসরকে ছাড়াই চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

সৌদি সূত্রগুলো অবশ্য মিসর নিজে থেকেই চুক্তিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল- এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। সৌদি রাজপরিবারের সাবেক ওই উপদেষ্টা বলেন, মিসরই চুক্তিতে যোগ দিতে চায়নি- এমন দাবি ‘হাস্যকর’।
তার দাবি, সিসি এই চুক্তিতে যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন, কারণ এর মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সৌদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা সিসির আনুগত্য নিয়ে গুরুতরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতৃত্বের মতো তাকে বিশ্বাস করেন না বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝি তুর্কিরা মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল এবং কেন চেয়েছিল, সেটিও বুঝি। হয়তো ভবিষ্যতে পরিস্থিতির পরিবর্তন বা উন্নতি হলে বিষয়টি আবার বিবেচনা করা হতে পারে।’
সৌদি সূত্রগুলোর মতে, মিসরকে বাইরে রাখার কারণ শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়; সামরিক সক্ষমতাও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেন, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত আধুনিক ও উন্নত হচ্ছে। পাকিস্তানের রয়েছে শক্তিশালী অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বড় স্থায়ী সামরিক বাহিনী। বিপরীতে, মিসরের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ বেসামরিক পণ্য উৎপাদনে কেন্দ্রীভূত এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে দেশটি তুরস্ক বা পাকিস্তানের সমপর্যায়ের অবদান রাখতে পারবে না।
এক সৌদি সূত্র বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর কাজ হওয়া উচিত সামরিক উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগ করা, খাবারের কারখানায় বিনিয়োগ ও সেগুলো পরিচালনায় ব্যস্ত থাকা নয়।’
মিসরের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি ও কার্যকারিতা নিয়েও সূত্রগুলো প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় মিসর বাস্তবে কতটা সামরিক অবদান রাখতে পারবে- সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে মিসরের প্রভাব কমছে?
সৌদি আরবের এই মূল্যায়ন এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মিসরের প্রভাব কমে যাওয়ার বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা মিসর এখন মধ্যস্থতাকারী ও সামরিক শক্তি- দুই ভূমিকাতেই অনেকটা ‘পাশ কাটিয়ে’ দেয়া হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার ছিল মিসর। ১৯৯১ সালে ইরাকের বাহিনীকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটেও মিসর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু সৌদি সূত্রগুলোর মতে, সিসির শাসনামলে মিসর ক্রমেই বাইরের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বিনিময়ে কম সহযোগিতা দিচ্ছে।

সৌদি রাজপরিবারের সাবেক ওই উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্ক ওঠানামা করলেও সৌদি নেতৃত্ব কায়রোর তুলনায় তুরস্ককে বেশি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে।
তিনি বলেন, ‘সৌদি নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে সিসির আনুগত্য নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। তাকে বিশ্বাস করা যায় না- এমনটাই মনে করা হয়।’ এর বিপরীতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ককে তিনি বেশি নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।
সৌদি আরবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মিসরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না করার পক্ষে মতামত দেখা যাচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বের সমর্থক কয়েকটি অ্যাকাউন্টে এমন পোস্ট দেয়া হয়েছে, যেখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে মিসরকে এই জোটে আপাতত স্বাগত জানানো হচ্ছে না।

সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৌদ আল-কাহতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় এমন একটি বেনামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যারা শুধু নিজেদের সমস্যা সমাধান ও সুবিধা নেয়ার জন্য জোটে আসতে চায়, কিন্তু একই আঞ্চলিক নিরাপত্তা মিশনে অংশ নিতে চায় না, তাদের জন্য জোটের দরজা খোলা নয়।

ওই পোস্টে আরও বলা হয়, জোটে যোগ দিতে হলে তিন দেশের অভিন্ন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। একতরফা সুবিধা নেয়া ও ‘দান-খয়রাতের’ যুগ শেষ হয়েছে; এখন তিন দেশের ‘অভিন্ন ভাগ্য’-এর সময়।

তবে সৌদি সূত্র তিনটিই জানিয়েছে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরের ভবিষ্যতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। রিয়াদের বর্তমান অবস্থান হলো—মিসরকে আপাতত জোটের বাইরে রাখা হবে; ভবিষ্যতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে কায়রোর সদস্যপদ নিয়ে আবার আলোচনা হতে পারে।