সারের বস্তায় সিন্ডিকেটের থাবা, বিপন্ন কৃষকের স্বপ্ন

সারের বস্তায় সিন্ডিকেটের থাবা, বিপন্ন কৃষকের স্বপ্ন

ফন্ট সাইজ:

​বাংলাদেশ মূলত কৃষিনির্ভর। দেশের ১৮ কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি এই কৃষক সমাজ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ এই অন্নদাতাদের জীবন ও স্বপ্ন একটি অসাধু, অর্থলোভী সিন্ডিকেটের অমানবিক গ্রাসে চরম বিপন্ন। কৃষি উৎপাদনের সবচেয়ে মৌলিক ও স্পর্শকাতর উপাদান হল সার। এটি এখন পরিণত হয়েছে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অতি-মুনাফা লোটার হাতিয়ারে। সারের বস্তায় সিন্ডিকেটের এই বিষাক্ত থাবা কেবল কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে না, বরং সামগ্রিক জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে ঠেলে দিচ্ছে এক অমাবস্যার আঁধারে।

সহযোগী একটি দৈনিকের সরেজমিন প্রতিবেদন বলছে, সম্প্রতি রাজশাহী অঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকা—মোহনপুর, তানোর, গোদাগাড়ী এবং পবা ঘুরে যে শিউরে ওঠার মতো সত্য উন্মোচিত হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক সারের বাজারের এক ক্ষুদ্র ও প্রামাণ্য রূপক মাত্র। বর্তমানে বরেন্দ্র এলাকা জুড়ে চলছে আমন রোপণ ও জমি প্রস্তুতির তুমুল কর্মযজ্ঞ। আগস্টের শেষ নাগাদ বিস্তৃত এই মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় প্রান্তিক কৃষকরা এক-দুই বস্তা সারের জন্য এক দোকান থেকে অন্য দোকানে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

​সরকারি খাতায় সার পর্যাপ্ত, কিন্তু কৃষকের হাতে সার নেই। বিএডিসির তথ্য ও বরাদ্দ তালিকা অনুযায়ী জুলাই এবং আগস্ট মাসে নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ বাড়ানো সত্ত্বেও ডিলারদের গোডাউনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে। অভিযোগের তির সরাসরি ডিলার, অবৈধ খুচরা বিক্রেতা এবং তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কৃষি কর্মকর্তাদের ত্রিমুখী সিন্ডিকেটের দিকে:
ডিলাররা সরকারি গোডাউন থেকে সার তুলে দোকানে নেওয়ার আগেই বরাদ্দের কাগজ বিক্রি করে দিচ্ছেন কালোবাজারিদের কাছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক জেলার বরাদ্দকৃত সার অধিক মুনাফার লোভে পাচার হয়ে যাচ্ছে অন্য জেলা বা উপজেলায়।

সরকার নির্ধারিত দামে সার কেনার কোনো উপায় কৃষকের রাখা হয়নি। ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি যার সরকারি মূল্য ১,৩৫০ টাকা, তা কৃষককে কিনতে হচ্ছে ১,৭০০ থেকে ১,৮০০ টাকায়। ১,০৫০ টাকার ডিএপি ও এমওপি বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা।

বিএডিসির সারস্বীকৃত ডিলারের কাছে গেলে সাফ জবাব—"মজুত শেষ।" কিন্তু পাশের অবৈধ খুচরা দোকানে গেলে বস্তা বস্তা সার পাওয়া যাচ্ছে, তবে শর্ত একটাই—দ্বিগুণ দাম দিতে হবে।

মাঝারি ও প্রান্তিক কৃষকদের যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে সারের পেছনে এই অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা ঢালতে গিয়ে তারা দেনা ও দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।

​জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই খাতটিতে তদারকি ব্যবস্থার যে চরম ধস নেমেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে 'সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি' নিয়মিত মিটিং করে খাতাপত্রে দেখাচ্ছে—সারের কোনো সংকট নেই, দামও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বাস্তবতা এর বিপরীত।

​জেলা তদারকি কমিটির কর্ণধার বা জেলা প্রশাসকদের বক্তব্য—"তথ্য দিলে বা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" কিন্তু প্রশাসনিক এই গতে বাঁধা আশ্বাসের কোনো কার্যকর প্রতিফলন মাঠে দেখা যায় না। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা, যাদের কাজ ছিল ডিলারদের গুদাম তদারকি করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সেই কর্মকর্তাদের একাংশের বিরুদ্ধে অসাধু ডিলার ও অবৈধ খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ গাঁটছড়ার অভিযোগ রয়েছে।

​তদুপরি, প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর এক অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যখন ডিলার বরাদ্দ তুলে নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন, তখন বিএডিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অজুহাত দিচ্ছেন—"কৃষক জমিতে অতিরিক্ত সার দিচ্ছেন বলেই এই সংকট!" এটি কেবল চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই নয়, বরং নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে ভুক্তভোগী কৃষকের ওপর দোষ চাপানোর এক অপচেষ্টা।

সার কেবল কোনো রাসায়নিক দ্রব্য নয়; এটি সরাসরি ফসলের পুষ্টি ও উৎপাদনের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারসাজি করে সারের কৃত্রিম সংকট ও আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর যে বহুমুখী আঘাত হানছে, তা অনুধাবন করা জরুরি:

সরকার কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে যাতে কৃষক সুলভ মূল্যে সার পেয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন সচল রাখতে পারেন। কিন্তু এই ভর্তুকির সুবিধা প্রান্তিক কৃষকের পকেটে না গিয়ে জমা হচ্ছে সিন্ডিকেটের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। কৃষকদের জিম্মি রেখে, তাদের পেটে লাথি মেরে কোনো দেশ বা সমাজ কখনো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে না।

দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে নিরাপদ রাখতে এবং কৃষকের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে এই সিন্ডিকেটের হাত ভেঙে দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কেবল মুখে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা না করে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে:

বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সার উত্তোলন থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষক পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনে 'ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম' চালু করতে হবে। সারের বস্তায় বিশেষ কিউআর কোড (QR Code) ব্যবহার করে ট্র্যাকিং করা যেতে পারে, যাতে বোঝা যায় সারের বস্তাটি কোন ডিলারের এবং তা কোথায় বিক্রি হচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী বা প্রভাবশালী বংশানুক্রমিক ডিলারশিপ প্রথা বাতিল করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় ডিলার নিয়োগ করতে হবে। যেসব ডিলার সারের খাতা বা গোডাউনে অনিয়ম করবেন, তাদের লাইসেন্স তাত্ক্ষণিকভাবে বাতিলসহ ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার করতে হবে।

শুধুমাত্র মিটিং বা আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সার বিতরণ মৌসুমে প্রতিদিন অবৈধ খুচরা দোকান ও ডিলারদের গুদামে সারপ্রাইজ ভিজিট ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।

যেসব মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তার ব্লকে সারের কালোবাজারি বা অতিরিক্ত দামে বিক্রি ধরা পড়বে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিলারের পাশাপাশি তদারকি কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটিকেও সমানভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

সারের ভর্তুকি ডিলারদের না দিয়ে ডিজিটাল 'কৃষক কার্ড'-এর মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের একাউন্টে পৌঁছানোর ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করা যেতে পারে, যাতে ডিলাররা সরকারি সারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ—এই বাক্যটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি বাংলাদেশের টিকে থাকার পরম সত্য। যে কৃষক রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেন, সারের বাজারে সিন্ডিকেটের কাছে তাদের জিম্মি হয়ে থাকা পুরো জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক। সারের কারসাজিতে যদি চলতি মৌসুমে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়, তার মাশুল গুণতে হবে পুরো ১৮ কোটি মানুষকে।

আমাদের মনে রাখা উচিত, কৃষকের কান্না সাময়িক হলেও এর পরিণতিতে সৃষ্টি হওয়া দুর্ভিক্ষ বা খাদ্য সংকট স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই কোনো অজুহাত বা কালক্ষেপণ নয়; সরকারি ডিলার, অসাধু ব্যবসায়ী কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের এই অশুভ জোটকে আইনি কঠোরতায় গুঁড়িয়ে দিতে হবে। সারের বস্তা থেকে সিন্ডিকেটের বিষাক্ত থাবা উপড়ে ফেলে কৃষকের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হোক বর্তমান সময়ের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]