দেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা। ২০২৫ সালের মাত্র এক বছরে সারা দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার অন্তত ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। আর এই আত্মহননের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হতাশা ও অভিমান। দেশের ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে গতকাল সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এমনই এক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
শনিবার ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট শীর্ষক সমীক্ষা’য় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ৪০৩ জন আত্মহননকারী শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৯০ জনই স্কুলপর্যায়ের, যা মোট ঘটনার ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া, কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৈশোরের সূচনালগ্নে আবেগীয় অস্থিরতা, পরিচয় সংকট এবং একাডেমিক চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সমীক্ষার লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ২৪৯ জন নারী এবং ১৫৪ জন পুরুষ। তাদের মধ্যে স্কুলপর্যায়ে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ, কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সেখানে ৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। তাই সমীক্ষা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কৈশোরে মেয়েরা পারিবারিক ও সামাজিক চাপ, সম্পর্কগত টানাপড়েন এবং আবেগীয় সংকটে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থান সংকট বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, ২৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ হতাশা থেকে এবং ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ আত্মহত্যার পেছনে অভিমান দায়ী। হতাশাজনিত আত্মহত্যার ক্ষেত্রে নারী ৬২ জন এবং পুরুষ ৫০ জন। অভিমানে আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী ৫৮ জন ও পুরুষ ৩৬ জন রয়েছেন। এ ছাড়াও একাডেমিক চাপে ৭২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যার অধিকাংশই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের। প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন, পারিবারিক টানাপড়েনে ৩২ জন, মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন এবং যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। সাইবার বুলিংয়ের কারণেও একজন নারী শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৬৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। এদের মধ্যে ১৯০ জন নারী ও ৭৮ জন পুরুষ। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ২২ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষ ৫১ জন এবং নারী ৪০ জন। ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ৪৪ জন শিশুর আত্মহত্যা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। চট্টগ্রামে ৬৩ জন, বরিশালে ৫৭ জন এবং রাজশাহীতে ৫০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আর এইসব আত্মহত্যার পেছনে পরিবারে খোলামেলা যোগাযোগের অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিং ব্যবস্থার ঘাটতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক অজ্ঞতাকে দায়ী করা হয়েছে। তাই আঁচল ফাউন্ডেশন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ, সামাজিক স্টিগমা কমাতে প্রচারণা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সাইকো-সোশ্যাল প্রশিক্ষণ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করা নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান কেবল একটি প্রতিবেদন নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা মোকাবিলায় আঁচল ফাউন্ডেশন পাঁচটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। এগুলো হলো- সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মনোসেবার এবং শিক্ষার্থীদের মেন্টাল হেলথ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, বিষণ্নতা বা উদ্বেগের চিহ্ন শনাক্ত করতে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ, আত্মহত্যা ও মানসিক সমস্যার ওপর সামাজিক স্টিগমা কমাতে সংবাদ, পোস্টার ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাইকো-সোশ্যাল প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ ঘটাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক কর্মসূচির আয়োজন করা। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কনসালট্যান্ট ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. আনিস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল আলম, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের সহকারী পরিচালক ডা. মারুফ আহমেদ খান, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সোহেল মামুন এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তানসেন রোজ।
এক বছরে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
স্টাফ রিপোর্টার
১ মার্চ (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
