বিভেদ নয়, সংহতির পথে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তির রূপরেখা

বিভেদ নয়, সংহতির পথে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তির রূপরেখা

ফন্ট সাইজ:

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত এক অনন্য জনপদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জাতিগত বৈচিত্র ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব সব মিলিয়ে এঅঞ্চল রাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবুও দীর্ঘদিন ধরে এখানে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও বৈষম্যের নানা অভিযোগ জমাট বেঁধে আছে। শান্তি চুক্তির পরও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ বাস্তবতায় পরিষ্কার হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ‘বিভেদ নয়, সংহতির’ রাজনীতি গ্রহণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন জেলায় বর্তমানে প্রায় বিশ লাখ মানুষের বসবাস। বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা, ম্রো, বম, খিয়াং, খুমি, পাংখোয়া, লুসাইসহ অসংখ্য জাতিসত্তা এখানে যুগের পর যুগ সহাবস্থান করে আসছে। এই বৈচিত্রই পাহাড়ের শক্তি। কিন্তু যখন উন্নয়ন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তখন বৈচিত্র শক্তি না হয়ে বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, তিন পার্বত্য জেলায় ২৬টি উপজেলা ও ৩০টি থানা থাকলেও সংসদীয় আসন মাত্র তিনটি। ভৌগোলিকভাবে বিশাল, দুর্গম ও যোগাযোগ-অবকাঠামো সীমিত এমন একটি অঞ্চলে একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়। সমতলে যেখানে কম জনসংখ্যা ও ছোট ভৌগোলিক পরিসরে একটি আসন গঠিত হয়, সেখানে পাহাড়ের বিস্তৃত জনপদকে একই মানদণ্ডে বিচার করা এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য। ফলে অনেক জনগোষ্ঠী নিজেদের প্রান্তিক ও বঞ্চিত মনে করে।

এই বৈষম্য কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থার সংকটও তৈরি করে। যখন কোনো ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায় না, তখন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জন্ম নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এই বঞ্চনা উগ্রতা ও সংঘাতকে উসকে দিতে পারে। তাই সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি। জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং থানার পুনর্গঠন করলে স্থানীয় সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তির পেছনে কেবল অভ্যন্তরীণ কারণ নয়, বহিরাগত প্রভাবও রয়েছে। ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্তবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চল ভূ-রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। সীমান্তবর্তী অবস্থান নানা আন্তর্জাতিক স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে পাহাড়কে। তাই অভ্যন্তরীণ ঐক্য জোরদার না হলে বহিরাগত নীলনকশা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও পাহাড়ে শান্তি অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব তাৎপর্যপূর্ণ। একটি বৃহৎ ‘জাতীয় উন্নয়ন ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা কমিটি’ গঠন করা হলে সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধান, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এমন একটি কমিটি পাহাড়ের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ক্ষুদ্রতম জাতিসত্তাকেও অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে তারা নিজেদের রাষ্ট্রের সমান অংশীদার হিসেবে অনুভব করবে।

প্রশাসনিক পুনর্গঠনও বিবেচ্য হতে পারে। তিনটি বৃহৎ জেলা ভেঙে ছোট ছোট প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করলে সেবা পৌঁছানো সহজ হবে। দুর্গম অঞ্চলে নতুন থানা স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন স্থানীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করবে। উন্নয়ন কেবল সড়ক বা ভবন নির্মাণ নয়; এটি মানুষের ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকেও পার্বত্য চট্টগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন, বনজ সম্পদ, কৃষি ও সীমান্ত বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সাজেক, নীলগিরি বা কাপ্তাই হ্রদের মতো পর্যটনকেন্দ্র আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা সম্ভব। তবে বিনিয়োগ ও পর্যটনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনৈক্য থাকলে সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। বাঙালি ও পাহাড়ি উভয়েই এই মাটির সন্তান। কাউকে উচ্ছেদ বা বঞ্চিত করে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমান মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি থাকতে হবে। জাতীয় পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ হলেও সেই পরিচয়ের ভেতরে বহু জাতিসত্তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। সংহতির রাজনীতি মানে একরূপতা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং বৈচিত্র্যের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামকে অবহেলা করে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রায় বিশ লাখ মানুষের এই জনপদকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসন, প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক কাঠামো ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং একটি শক্তিশালী সম্প্রীতি কমিটি গঠন এসব পদক্ষেপ শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।
বহিঃশত্রুর নীলনকশা প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অভ্যন্তরীণ ঐক্য। বিভাজনের রাজনীতি নয়, সংহতির দর্শনই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সময় এসেছে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার যাতে পাহাড়ের প্রতিটি জাতিসত্তা সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন অভিযাত্রায় অংশ নিতে পারে। একটি সংহত, বৈষম্যহীন ও শান্তিপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রামই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।

লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন