আমরা আজ কেমন এক নিথর, পাষাণ ও সংবেদনহীন সমাজে বাস করছি, যেখানে ধাতব ও প্লাস্টিকের একটি যন্ত্র কিংবা এক থালা ভাতের চেয়ে মানুষের জীবনের দাম সস্তা হয়ে গেছে? প্রশ্নটি কোনো অলঙ্কারিক সাহিত্য কিংবা কবিতার রূপক নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নগ্ন, রক্তাক্ত ও বিভীষিকাময় বাস্তবতা। বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য অগ্রগতি, চারপাশের চোখধাঁধানো ভৌত অবকাঠামো, জিডিপির অঙ্কের বৃদ্ধি আর আধুনিকতার চাকচিক্যের নিচে আমাদের সমাজব্যবস্থা ভেতর থেকে কতটা পচে গলে গন্ধ ছড়াচ্ছে, তা প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন একটি দামি ফোনের প্রলোভনে কিংবা একমুঠো চাল-ভাতের অপবাদে দুটো উদীয়মান, সম্ভাবনাময় তরুণ প্রাণ নির্মমভাবে ঝরে যায়, তখন আমাদের জাতীয় বিবেক কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে প্রশ্ন তোলে—সত্যিই কি এই দেশে মানুষের প্রাণের কোনো মূল্য অবশিষ্ট আছে? নাকি আমরা এমন এক সভ্যতায় রূপ নিয়েছি, যেখানে মাংস আর রক্তের চেয়ে জড়বস্তুর মূল্য অনেক বেশি?
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটি পৃথক অথচ হুবহু এক সুতোয় গাঁথা হিংস্রতার ঘটনা আমাদের সমাজকে আবারও চরম লজ্জার মুখে দাঁড় করিয়েছে। কুমিল্লায় ১৩ বছরের এক নিষ্পাপ কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম—যে কিনা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান—তার নিস্পন্দ, রক্তাপ্লুত দেহ উদ্ধার হলো লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে। তার অপরাধ ছিল সামান্যই; সে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার আকুতি নিয়ে মায়ের আইফোনটি হাতে করে বাসা থেকে বের হয়েছিল। মাত্র এক টুকরো কৃত্রিম প্রযুক্তির লোভে সেই অবুঝ শিশুটির মাথায় নির্মমভাবে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হলো। অন্যদিকে, রূপসা-ভৈরব পারের শহর খুলনায় ঘটে গেল আরেক মধ্যযুগীয় বর্বরতা। খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মো. আজমুল হোসেন, যে মাত্র ১০ দিন আগে একবুক স্বপ্ন ও আশার আলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, তাকে মেসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ তুচ্ছ অভিযোগে পিটিয়ে ও চারতলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে হত্যা করা হলো।
একদিকে একটি আইফোন, অন্যদিকে এক প্লেট ভাত—আর মাঝখানে পড়ে রইল দুটি নিস্পন্দ, নিথর দেহ। একটি সমাজ, রাষ্ট্র ও তার মূল্যবোধ কোন অতল গহ্বরে গিয়ে ঠেকলে এক টুকরো ফোন কিংবা কয়েক মুঠো ভাতের বিনিময়ে একজন জলজ্যান্ত মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া যায়, তা ভাবলে শরীরের প্রতিটি লোমকূপ শিউরে ওঠে।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর কুমিল্লার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর অশ্রুসজল আক্ষেপ কেবল একজন রাজনীতিবিদের তাৎক্ষণিক আবেগ ছিল না; তা ছিল পুরো জাতির এক গভীর পরাজয়ের স্বীকারোক্তি যেন। অপ্রতিমের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ দেখে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘একটা আইফোনের জন্য একটা মাসুম বাচ্চাকে এভাবে মারতে পারে? আমি কল্পনা করিনি। কী দেশ বানালাম। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি লজ্জিত। এই এলাকার এমপি হিসেবে আমি লজ্জিত, আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা এই মাসুম বাচ্চাদেরকেও রক্ষা করতে পারলাম না।’
যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, লাখো শহীদের আত্মত্যাগ ও মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এই স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছিল, আজ সেই দেশের জনপদে মানুষের রক্তের দাম এত সস্তা হলো কীভাবে? ১৯৭১ সালে আমরা যে মানবিক সাম্য, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ তা কোথায় হারিয়ে গেল? দেশের একজন প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা যখন নতশীরে শিশুর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থা কী অবস্থা। তাঁর কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা হয়তো বড় বড় সেতু আর দৃশ্যমান কাঠামো বানিয়েছি, কিন্তু মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক ভিত্তিটুকু গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি।
কুমিল্লার ঘটনার পাশাপাশি খুলনার আজমুল হত্যার প্রেক্ষাপট আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। নিহত আজমুলের দিনমজুর কৃষক পিতা কুতুব উদ্দিন ও তাঁর নিস্তব্ধ মা যখন থানার বেঞ্চে বসে থাকেন, আর অসহায় পিতা করুণ স্বরে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, বাড়ি অনেক দূরে। আমরা বিচার পাব না। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম, আল্লাহই বিচার করবে’—তখন সেই বাক্যগুলো প্রতিটি সচেতন মানুষের বুকে তীক্ষ্ণ তীরের মতো বিধে।
যখন একজন নাগরিক রাষ্ট্র কিংবা আইনের কাছে বিচার চাওয়ার সাহস ও ভরসা হারিয়ে ফেলে এবং বিচার পাওয়ার আশাই ছেড়ে দেয়, তখন বুঝতে হবে আইনশৃঙ্খলা ও বিচার কাঠামোর মেরুদণ্ড চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। আজমুল মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবারের কাছে ফোন করে ১ লাখ টাকা দাবি করার যে দুর্ধর্ষ মানসিকতা ঘাতকরা দেখিয়েছে, তা প্রমাণ করে সমাজে অপরাধীদের ভেতর আইনের কোনো ভয় অবশিষ্ট নেই। তারা খুব ভালো করেই জানে, ক্ষমতার দাপট কিংবা অর্থের প্রভাবে এই দেশে যেকোনো অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব। কুয়েট রোডে চুরির অভিযোগে সাজমীরকে পিটিয়ে হত্যা কিংবা শিশু অপহরণের সন্দেহে রাজুকে পিটিয়ে মারার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আমাদের সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বা ‘মব জাস্টিস’ চালানোর এক বিপজ্জনক মহামারি শুরু হয়েছে।
আমরা যদি বাংলাদেশের বর্তমান সার্বিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির দিকে চোখ ফেরাই, তবে এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর বৈপরীত্য দেখতে পাব। চাল, ডাল, তেল, চিনি থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রতিদিন আকাশচুম্বী হচ্ছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আজ সহনশীলতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাজারে যখন সবকিছুর দাম ক্রমাগত বাড়ছে, তখন প্রতিনিয়ত হু হু করে কমছে মানুষের জীবনের দাম। এখন সামান্য পারিবারিক কলহ, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য কিংবা মেসের এক প্লেট ভাতের হিসাব মেলানোর জন্য সহপাঠী বা প্রতিবেশীর হাতে নিভে যাচ্ছে তরতাজা জীবন। প্রযুক্তির ঝলকানি ও বস্তুবাদী মানসিকতা মানুষকে এতটাই অন্ধ ও সংবেদনহীন করে তুলেছে যে, একটা মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার জন্য ছোট ভাই সমতুল্য কাউকে হত্যা করতেও তাদের হাত কাঁপে না।
আজ কিশোর ও যুবসমাজের একাংশ যে পথভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, তার পেছনের সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কাবিলা ও গ্যাং কালচারের আগ্রাসন, মাদকের বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব—সব মিলিয়ে এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ কেবল জিপিএ-৫ আর ডিগ্রির কারখানা হয়ে উঠেছে, কিন্তু সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের যে শিক্ষা দরকার, তা সেখান থেকে হারিয়ে গেছে।
এই অমানবিকতার অতল গহ্বর থেকে আমাদের সমাজকে রক্ষা করতে হলে এখনই কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। কেবল চোখের জল ফেলা কিংবা গুটিকয়েক শোক প্রস্তাব পাস করাই শেষ কথা হতে পারে না।
১.অপ্রতিম ও আজমুল হত্যার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন, দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সংসদ সদস্যের দাবির মতো ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে, যেন অন্য অপরাধীরা ভয় পায়।
২.মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতিতে দমন করতে হবে। আইনের প্রয়োগ সর্বক্ষেত্রে সমান ও দ্রুত হতে হবে।
৩.পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের কেবল বস্তুগত সাফল্যের পেছনে না ছুটিয়ে নীতি-নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিক শিক্ষার পাঠ দিতে হবে। তরুণ সমাজকে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।
৪. বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হতে হবে। কোনো দরিদ্র পিতা যেন বিচার চাওয়ার আগেই হেরে না যান, তার জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা ব্যবস্থা আরও গতিশীল করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, একটি আইফোন কিংবা এক প্লেট ভাতের বিনিময়ে দুটি তরতাজা লাশের রক্তের দাগ কি আমরা এত সহজে মুছে ফেলতে পারব? রাষ্ট্র ও সমাজ যদি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যূনতম নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তবে আমাদের এই বাহ্যিক উন্নয়ন, বড় বড় অট্টালিকা আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একেবারে অর্থহীন ও ফাঁপা বলে প্রমাণিত হবে। অপ্রতিম ও আজমুলের মতো নিষ্পাপ কিশোর ও যুবকদের রক্ত যেন কেবল পত্রিকার পাতায় বা সংবাদের খবরের খাতা হয়ে হারিয়ে না যায়। তাদের এই করুণ প্রস্থান আমাদের ঘুমন্ত ও নিথর বিবেককে নাড়া দিক। মানুষের জীবনের মান ও মূল্য আবার ফিরে আসুক এই দেশে—যেন আর কোনো নিঃস্ব পিতা-মাতাকে সন্তানের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে না হয়, ‘আমি বিচার চাই না, আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।’ মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন।
ই-মেইল:[email protected]
একটি আইফোন, এক প্লেট ভাত আর দুটি লাশ—মানুষের জীবনের মূল্য কোথায়?
আহসান হাবিব বরুন
মত-মতান্তর
৪৯ মিনিট আগে
২০ সেপ্টেম্বর (রবিবার), ২০২৬, ১১ঃ০৪ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
