কুমিল্লায় ভারতীয় নাগরিক অলিউলের বিরুদ্ধে মিথ্যা ছিনতাই নাটক সাজানোর অভিযোগ

ফন্ট সাইজ:

কুমিল্লায় ইয়াবা কারবারের অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নজরদারিতে থাকা ভারতীয় নাগরিক অলিউল আলম (৪২) নিজের অপরাধ আড়াল করতে কোতোয়ালি মডেল থানায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ। অলিউল আলম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সিপাহিজলা জেলার বক্সনগর থানার রহিমপুর গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভিসা নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেন অলিউল আলম। সম্প্রতি তার ইয়াবা কারবারের বিষয়ে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে গোপন তথ্য আসে। পরে তার গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু করে ডিবি পুলিশ।

ডিবি পুলিশের দাবি, অলিউল আলম বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে ইয়াবার স্যাম্পলের ছবি ও ভিডিও পাঠাতেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে ডিবির এসআই তৌকিক হোসেন সঙ্গীয় ফোর্সসহ তার ওপর অনলাইনে নজরদারি শুরু করেন।

গত ৩০শে জুলাই ডিবির এক সোর্স অলিউল আলমের কাছে ইয়াবা কেনার প্রস্তাব দেন। ওই দিন দুপুরে কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার বাহার মার্কেটের নিচতলায় ইয়াবার একটি প্যাকেট নিয়ে উপস্থিত হন তিনি। এ সময় আগে থেকে সেখানে অবস্থান নেওয়া ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাকে আটক করে তল্লাশি চালান।

ডিবি পুলিশের ভাষ্য, প্যাকেটটি খুলে ইয়াবার পরিবর্তে বুটের ডাল পাওয়া যায়। পরে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং ঘটনার ভিডিও ধারণের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে তার ইয়াবা বিক্রির বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ডিবি পুলিশের দাবি, এসব ঘটনা আড়াল করতেই পরে অলিউল আলম কোতোয়ালি মডেল থানায় ৫ থেকে ৬ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ করেন।
অভিযোগে অলিউল আলম উল্লেখ করেন, বৈধ কাগজপত্র ও পাসপোর্টের মাধ্যমে গত ৩০শে জুলাই সকাল ১০টার দিকে বিবির বাজার চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর কুমিল্লার বুড়িচং থানার আবদুল মতিন ডিগ্রি কলেজ-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত তার খালাতো ভাই মাহাবুবুল আলমের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
পরে খালাতো ভাইয়ের পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কান্দিরপাড়ের বাহার মার্কেটের সামনে পৌঁছালে ৫ থেকে ৬ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তার পথরোধ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা তার কাছে অবৈধ মালামাল রয়েছে বলে তাকে একটি বিরিয়ানি দোকানের ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে তার কাছ থেকে ভারতীয় ১৭ হাজার ৫০০ রুপি, বাংলাদেশি নগদ ১১ হাজার ৩০০ টাকা এবং গলায় থাকা আনুমানিক ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের এক ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অলিউল আলম আরও অভিযোগ করেন, ছিনতাইকারীরা তাকে থানায় সোপর্দ করার হুমকি দিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে সরজমিনে ঘটনাস্থল কান্দিরপাড়ের বাহার মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হয়। সরজমিন অনুসন্ধানে অলিউল আলমের অভিযোগে বর্ণিত সময় ও ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
অভিযোগে যে স্থানে তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেই এলাকার লোকজন ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও অভিযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সরজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে পুলিশি তদন্ত চলমান থাকায় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ডিবি পুলিশের দাবি, স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশে ইয়াবা কারবার আড়াল করতেই অলিউল আলম এই ছিনতাইয়ের অভিযোগ করেছেন। যদিও তার দায়ের করা অভিযোগে ডিবি পুলিশ বা কোনো পুলিশ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে অলিউল আলম বলেন, আমি ভারতীয় নাগরিক বুঝতে পেরে ছিনতাইকারীরা আমার টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই।
ডিবির এসআই তৌফিক হোসেন বলেন, সেদিন তার কাছে ইয়াবা না পাওয়ায় আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি। কুমিল্লার বহু মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার যোগসাজশ পাওয়া গেছে। তার ইয়াবা বিক্রির ছবি ও ভিডিও আমাদের হাতে রয়েছে।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, “ভারতীয় এক নাগরিকের দেওয়া একটি অভিযোগ পেয়েছি। তবে তার বিরুদ্ধে ইয়াবা বিক্রির বেশ কিছু ছবি পুলিশের হাতে এসেছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”

কুমিল্লা ডিবির ওসি মো. শামসুল আলম শাহ বলেন, “অলিউল আলম একজন পেশাদার ইয়াবা ব্যবসায়ী। ইয়াবা ব্যবসা আড়াল করতেই সে মিথ্যা ছিনতাইয়ের অভিযোগ দায়ের করেছে। বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে পাঠানো তার ইয়াবার ছবি ও ভিডিও আমাদের হাতে এসেছে। আমরা তার গতিবিধির ওপর নজর রাখছি।”
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন