ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা বেকাররা চায় কর্মের সুযোগ

হতদরিদ্রদের প্রত্যাশা

ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা বেকাররা চায় কর্মের সুযোগ

ফন্ট সাইজ:

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের ক্ষমতা শেষে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন সরকারের কাছে দেশবাসীর অনেক প্রত্যাশা। বৈষম্যবিরোধী চেতনার ওপর ভিত্তি করে যে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে, সেখানে প্রতিটি পেশার মানুষের আলাদা আলাদা দাবি ও প্রত্যাশা রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো কৃষক ও খামারিরা। দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট প্রথা এবং সারের কৃত্রিম সংকটে তারা ছিল দিশাহারা। নতুন সরকারের কাছে কৃষকের প্রধান দাবি হলো কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা। খামারিদের প্রত্যাশা, পোল্ট্রি ও গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্য হ্রাস করে দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনে সরকারি ভর্তুকি বৃদ্ধি করা। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলে প্রান্তিক চাষিরা লাভবান হবেন। উত্তরের জেলা গাইবান্ধার মোন্তাছির রহমান, মাটি কামড়ে পড়ে থাকা একজন সাধারণ কৃষক। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সরকারের কাছে তিনি প্রত্যাশা রাখেন, হয়তো এবার তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির একটু দাম মিলবে। তার প্রথম ও প্রধান চাওয়া হলো ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। তার ভাষ্যমতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান-পাট ফলাই, কিন্তু যখন বাজারে যাই, দেখি দালালেরা সব লাভ খেয়ে নিচ্ছে। সরকার যদি সরাসরি আমাদের মতো কৃষকদের কাছ থেকে শস্য কেনার স্থায়ী ব্যবস্থা করেন, তবে আমাদের আর পথে বসতে হবে না। আগে দেখেছি সারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে মার খেতে হয়েছে, আবার কখনো চড়া দামে সার কিনতে হয়েছে। নতুন সরকারের কাছে অনুরোধ, সার, বীজ আর কীটনাশকের দাম যেন সবসময় আমাদের হাতের নাগালে থাকে। সেচের জন্য ডিজেল আর বিদ্যুতের পেছনেই আমাদের আয়ের বড় অংশ চলে যায়। যদি সেচ কাজে ভর্তুকি বাড়ানো হতো, তবে একটু স্বস্তিতে চাষবাস করতে পারতাম। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আমাদের নিত্যসঙ্গী। বন্যায় বা খরায় যখন ফসল নষ্ট হয়, তখন আমাদের ঋণের জালে জড়িয়ে যেতে হয়। আমরা চাই সহজ শর্তে এবং বিনা সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা, যাতে মহাজনের কাছে চড়া সুদে টাকা নিতে না হয়। কৃষি বিমার সুবিধা যদি ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া যায়, তবে আমাদের বড় একটা দুশ্চিন্তা কমবে। গ্রামের হাটে বা গঞ্জে পণ্য নিতে গেলে পদে পদে যে হয়রানি আর চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়, সেটার অবসান চাই। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হলে আমরা আমাদের খেতের সবজি বা ফলমূল দ্রুত শহরে পাঠাতে পারতাম। আমাদের জন্য আধুনিক চাষাবাদের প্রশিক্ষণ আর উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হোক। আমরা খুব বেশি বিলাসিতা চাই না, শুধু চাই আমাদের ঘামের বিনিময়ে পাওয়া ফসলটুকু যেন সম্মানের সঙ্গে বিক্রি করে পরিবার নিয়ে দু’বেলা ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারি। বিগত শাসনামলে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং চাঁদাবাজি জেঁকে বসেছিল, তা থেকে মুক্তি চায় দেশের লাখো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। নতুন সরকারের কাছে তাদের প্রধান চাওয়া একটি ভয়ভীতিহীন বিনিয়োগের পরিবেশ। ট্রেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উৎকোচ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনাই হবে এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বগুড়ার গোদারপাড়া বাজারের চাল ব্যবসায়ী আসাদুল ইসলাম আসাদ, ছোটখাটো ব্যবসা করে কোনোমতে সংসার চালান। তার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় কোনো চাওয়া নেই, শুধু শান্তিতে দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকার পরিবেশ চাই। নতুন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে এই সরকারের জন্য একটাই প্রার্থনা, যেন আমাদের ওপর আর কোনো জুলুম না হয়। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা রাজনৈতিক দলবাজি আর প্রকাশ্য চাঁদাবাজির শিকার হয়েছি। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিদিন যে টাকা দিতে হতো, সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই। নতুন সরকারের কাছে আমার প্রথম দাবি হলো একটি ভয়ভীতিহীন ব্যবসার পরিবেশ। আমরা যেন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত টাকা কোনো লাঠিয়াল বা দালালের হাতে তুলে দিতে বাধ্য না হই। আগে দেখেছি ব্যবসা করতে গেলে পদে পদে হয়রানি হতে হতো। ট্রেড লাইসেন্স করা থেকে শুরু করে সামান্য সরকারি সুযোগ পেতেও টেবিলের তলা দিয়ে টাকা দিতে হতো। আমরা চাই এই দুর্নীতির অবসান। এ ছাড়া আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ঋণের দরজা সবসময় বন্ধ থাকে। আমরা যদি সহজ শর্তে আর অল্প সুদে ঋণ পেতাম, তবে মহাজনের চড়া সুদের খপ্পরে পড়তে হতো না। বাজারে এখন সিন্ডিকেটের কারণে সব জিনিসের দাম আকাশচুম্বী। পাইকারি বাজারে মাল কিনতে গেলে আমাদের যে হিমশিম খেতে হয়, তার প্রভাব পড়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। সরকার যদি বড় বড় সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে আমরাও সস্তায় মাল কিনে সস্তায় বিক্রি করতে পারবো। রাস্তার ধারের ছোট দোকানদার বা হকারদের জন্য সরকার যেন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। উচ্ছেদ আতঙ্কে সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হয়। একটু সুস্থভাবে বসার জায়গা পেলে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারব। নতুন সরকারের কাছে সাধারণ নাগরিকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও মেরামত। প্রতিটি দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া। কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং সাধারণ মানুষের সরকার হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই হবে প্রকৃত গণতন্ত্রের বিজয়। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে নতুন পথচলা শুরু হয়েছে, সেখানে মানুষের প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে। বৈষম্যের শিকার হওয়া প্রতিটি মানুষ আজ আশায় বুক বেঁধেছে। সরকার যদি তাদের এই মৌলিক ও যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করতে পারে, তবেই গণ-আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে এবং বাংলাদেশ একটি সত্যিকার সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। পরীক্ষা হলেও রেজাল্ট হতে দীর্ঘ সময় লাগত। আমরা চাই একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা হোক। চাকরির আবেদনের ফি আমাদের মতো বেকারদের জন্য এক বিরাট বোঝা। নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এই ফি যেন পুরোপুরি মওকুফ করা হয় অথবা একদম নামমাত্র করা হয়। এ ছাড়া সরকারি চাকরির বয়সসীমা নিয়ে যে বৈষম্য আছে, তা নিরসন করে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা হোক। আমরা শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করতে চাই না, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে যে পুঁজি বা ঋণের প্রয়োজন, তা পাওয়া আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সরকার যদি জামানতবিহীন ও সহজ শর্তে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে, তবে আমরা নিজেরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবো। কারিগরি শিক্ষা আর ফ্রিল্যান্সিং-এর মতো আধুনিক খাতগুলোতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দেবে। বিগত বছরগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস আর নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে আমরা মেধাবীরা বারবার পিছিয়ে পড়েছি। আমরা চাই- এই দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলা হোক এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হোক। প্রতিটি জেলায় আইটি পার্ক আর শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে শহরমুখী হওয়ার চাপ কমবে। আমরা খুব বেশি বিলাসিতা চাই না, শুধু চাই, আমাদের অর্জিত ডিগ্রির মর্যাদা আর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের সার্থকতা। নতুন সরকার যদি আমাদের এই তারুণ্যের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে, তবে এই দেশ সত্যিই বদলে যাবে। আমরা আর বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে বাঁচতে চাই না, আমরা চাই উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হতে। গণমাধ্যমকর্মীদের চাওয়া: সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ। বিগত দিনে সাংবাদিকদের ওপর যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের খড়্‌গ ছিল, তা পুরোপুরি বাতিল করে স্বাধীন সাংবাদিকতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। বিশেষ করে সত্য লিখতে গিয়ে যেন কোনো সাংবাদিককে মামলা বা হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা নতুন সরকারের প্রধান কাজ।
একইসঙ্গে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা খুব জরুরি। সরকারি কোনো দপ্তরে তথ্য চাইলে যেন তা সহজে পাওয়া যায় এবং সচিবালয় বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাংবাদিকদের প্রবেশে কোনো বাধা না থাকে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তথ্যের দুয়ার উন্মুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। নিরাপত্তার বিষয়টিও অনেক বড়। সাগর-রুনির মতো সাংবাদিক দম্পতি হত্যার বিচারসহ অতীতে যত সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় যেন কোনো দল বা গোষ্ঠীর হাতে সাংবাদিকরা হেনস্তা না হন, তার কঠোর আইনি নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আর্থিক সুরক্ষা ছাড়া সাংবাদিকতা টেকসই হয় না। তাই নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। কোনো সংবাদকর্মী যেন বিনা নোটিশে চাকরি না হারান, সেদিকেও নজর দেয়া দরকার। সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক এসএম আবু সাঈদ বলেন, গণমাধ্যমকে যেন সরকারের মুখপত্র বা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রচারক হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। সরকারি এবং বেসরকারি উভয় মিডিয়াতে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা এবং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য প্রচারের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে নতুন সরকারকে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য এই সরকারের কাছে সাংবাদিকদের মূল দাবি।
জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে: বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে অভিশাপ নয় বরং আশীর্বাদে রূপান্তর করতে হলে গতানুগতিক পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে এসে কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের একটি বড় প্রত্যাশা হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো যাতে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবন শেষ করেই বেকারত্বের কবলে না পড়ে। বর্তমান বিশ্বে শুধু ডিগ্রি দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয় বরং কারিগরি জ্ঞান ও হাতেকলমে কাজ জানাই হলো আসল শক্তি। সরকার যদি প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে উন্নতমানের টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে তবে আমাদের তরুণ সমাজ বিশ্ববাজারের উপযোগী হয়ে গড়ে উঠবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন