ফেনীতে জুলাই গণহত্যা

এবার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রস্তুতি

ফন্ট সাইজ:

ফেনীতে জুলাই আন্দোলনে গণহত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতে ২২ মামলার পর এবার মানবতাবিরোধী অপরাধে মামলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি)। এরইমধ্যে মামলার সব প্রস্তুতি শেষও হয়েছে। বাদী, আসামি ও সাক্ষীর তালিকা চূড়ান্ত হওয়ায় চলতি মাসেই মামলার জন্য আবেদন জমা দেয়া হবে আদালতেÑ এমনটি নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র। ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট এক দফার আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্র-জনতার ওপর বর্বরোচিত হামলায় জড়িতদের পরিচয় নিশ্চিত করার পর মামলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ভিডিও ফুটেজ দেখে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরইমধ্যে কাদের এ মামলায় আসামি করা হবে, তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাদী ও সাক্ষীও চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই বাদী ও সাক্ষীদের সঙ্গে শেষবারের মতো বৈঠক করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ফেনী সফর করে গেছেন আমিনুল ইসলাম। এ সময় তিনি জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আদালত ও মামলা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। তার আগের সপ্তাহেও আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর ফেনী সফর করেন। সবমিলিয়ে ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার আবেদন করার পক্ষে সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রটি জানিয়েছে, এ মামলায় আসামি করা হতে পারে ৬০ থেকে ৬৫ জনকে। এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। বিশ্বস্ত একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে মামলায় আসামি করা হবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী, ফেনী-১ আসনের সাবেক এমপি আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। এর বাইরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর আটক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন ও ১/১১ এর কুশীলব অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও এ মামলায় আসামি করা হচ্ছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। এ ছাড়া, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুশেন চন্দ্র শীল, ফেনী পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজি, ছাগলনাইয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সোহেল চৌধুরী, সোনাগাজী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, দাগনভূঞা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবীর রতনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি করা হবে। সূত্রটি বলছে, গণহত্যায় সংশ্লিষ্টদেরই মামলায় আসামি করা হবে।

এরইমধ্যে মামলার এজাহার প্রস্তুত করা হয়েছে। আইসিটির তদন্তকারী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন পলাশ বাদী হয়ে এ মামলার আবেদন করবেন বলেও জানা গেছে। এরইমধ্যে সাক্ষী হিসেবে ১৫ জনের নামের তালিকা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি পাঠানো হবে ২/১ দিনের মধ্যে। সাক্ষীদের সবাই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এদের সবাই জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলেন ও ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট ফেনীর মহিপালে গণহত্যার সাক্ষীও। তাদের মধ্যে থাকতে পারেন ফেনী পৌর বিএনপি’র সদস্য সচিব এডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঁঞা। এ ছাড়া, আরেক সাক্ষী হিসেবে আইসিটি আদালতে দ্বিতীয়বার হাজির হবেন জুলাইযোদ্ধা যুবদল নেতা নানির উদ্দিন। তিনি ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা’ ফেনী ইউনিটের সদস্য সচিব। এরইমধ্যে ওই আদালতে একটি মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন নাসির। এ ছাড়া, জুলাই শহীদ ওয়াকিল আহমেদ শিহাবের মাকেও সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। ফেনী জেলা আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দিন খান জানান, হত্যাচেষ্টা আর বিস্ফোরক আইনের ১৫টি মামলা ফেনীর আদালতে বিচার হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আইসিটিতে একটি মামলা দায়ের করা হবে।

এর আগে, ফেনীতে ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় সাত হত্যাসহ ২২টি মামলার বিচারকাজ হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয় নিম্ন আদালত। মামলায় আসামির সংখ্যা, দুর্বল চার্জশিট ও ঘটনায় জড়িত না থাকা ব্যক্তিদের জড়ানোসহ নানা অসঙ্গতি খুঁজে পায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। আদালতের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মামলাগুলো পর্যবেক্ষণ করার পরই তোলপাড় শুরু হয় ফেনীর প্রশাসন ও আইন অঙ্গনে। সম্প্রতি ফেনী জেলা আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দিন খান ও মামলাগুলোর বাদী পক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভুঁঞাকে ঢাকায় ডেকে পাঠান আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর। এ সময় ২২টি মামলার নথি পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত দেন তিনি। আদালতের বিচারক, আইনজীবী, তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মামলা সংশ্লিষ্টজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আইসিটিতে মামলার সিদ্ধান্ত নেন চিফ প্রসিকিউটর।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন